ইসলামের পরিচয়

‘ইসলাম’ শব্দের অর্থ

ইসলাম আরবী শব্দ। এর অর্থ আত্মসমর্পণ। আত্ম মানে নিজ, সমর্পণ মানে স্বত্ব ত্যাগ করে দিয়ে দেওয়া। আত্মসমর্পণ অর্থ— নিজেকে অন্য কারো অধীন করে দেওয়া।

কুরআন ও হাদীসে ‘ইসলাম’ শব্দ দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার নিকট আত্মসমর্পণ বোঝানো হয়েছে। আর যে আল্লাহ তা‘আলার নিকট নিজেকে সমর্পণ করে তাকে ‘মুসলিম’ বলা হয়। এর সহজ অর্থ হলো নিজের মর্জি ও ইচ্ছামতো না চলে আল্লাহ তা‘আলার হুকুমমতো চলা। যে এভাবে চলে সে-ই মুসলিম বা আত্মসমর্পণকারী।

ইসলাম শব্দ থেকেই ‘আসলামা’ শব্দ এসেছে। এর অর্থ সে ইসলাম কবুল করেছে বা আত্মসমর্পণ করেছে। এভাবেই ‘আসলামতা’ মানে আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম বা আত্মসমর্পণ করলাম। যেমন, ইবরাহীম আ. এর কথা কুরআনে আছে,

أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ

অর্থাৎ, ‘আমি সারাজাহানের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করেছি।’ (সূরা বাকারা: ১৩১)

ইসলাম শব্দের আরেকটি অর্থ হলো শান্তি। ‘আস্‌সালামু আলাইকুম’ অর্থ আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আস্‌সালাম ও ইসলাম একই ক্রিয়ামূলের শব্দ। আল্লাহর হুকুমমতো চললেই শান্তি পাওয়া যায়। সকল মানুষই শান্তি চায়। শান্তি পেতে হলে ইসলামের বিধানমতো চলতে হবে। তাই আল্লাহ তা‘আলা মানুষের জন্য যে জীবনবিধান পাঠিয়েছেন তার নাম রেখেছেন ইসলাম।

‘দীন’ শব্দের অর্থ

আল কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন—

إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ

অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই ইসলাম আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দীন (হিসেবে গণ্য)।’

সূরা মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا

অর্থাৎ, ‘এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন হিসেবে মনোনীত করে আমি সন্তুষ্ট।’

এ দুটো আয়াতে ইসলামকে ‘দীন’ বলা হয়েছে। আমরা ‘দীন ইসলাম’ কথাটি বলেও থাকি। অনেকেই দীন ইসলামের বাংলা অর্থ ‘ইসলাম ধর্ম’ মনে করে। এটা একেবারেই ভুল অর্থ। ‘দীন’ শব্দের অর্থ না জানার কারণেই এ ভুল করা হয়।

‘দীন’ অর্থ যদি ‘ধর্ম’ মনে করা হয়, তাহলে ইসলামকে অন্যান্য ধর্মের মতোই একটা ধর্ম বলে বোঝা যাবে। ইসলাম শুধু মানুষের ধর্মীয় দিকের বিধান দেয়নি, জীবনের সব দিকের বিধানই ইসলাম দিয়েছে। তাই ‘ইসলাম ধর্ম’ কথাটি সঠিক নয়। ‘আল্লাহ’ শব্দের যেমন কোনো অনুবাদ দরকার হয় না, তেমনি আরবী ‘দীন’ শব্দেরও অনুবাদের দরকার নেই। আমরা ‘দীন ইসলাম’ই বলব। যেহেতু ‘দীন’ শব্দের অর্থ ‘ধর্ম’ বললে আসল অর্থ বোঝা যায় না, তাই ‘ইসলাম ধর্ম’ কথাটি বলা ঠিক নয়।

কিন্তু ইসলামকে যখন আল্লাহ ‘দীন’ বলেছেন, তখন দীন অর্থ জানা খুবই জরুরি। ‘দীন’ শব্দের আসল অর্থ আনুগত্য করা বা মেনে চলা। আমরা বাপ-মায়ের কথা মেনে চলি। দেশের আইন মেনে চলি। আল্লাহকে মেনে চলাই হলো দীন। আর এ দীনের নাম আল্লাহ-ই রেখেছেন ‘ইসলাম’। আল্লাহকে মেনে চলার জন্য ইসলাম নামে মানুষকে যে নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধান তিনি দিয়েছেন তা-ই ‘দীন ইসলাম’।

সব সৃষ্টির জন্যই আল্লাহ নিয়মকানুন দিয়েছেন

আল্লাহ তা‘আলা মানুষের জন্য যেমন বিধি-বিধান দিয়েছেন, তেমনি যত কিছু পয়দা করেছেন ছোট-বড় প্রতিটি সৃষ্টির জন্যই বিধান তৈরি করেছেন। একটা ঘাসের বেঁচে থাকার জন্য কী কী দরকার তা তিনিই ফায়সালা করে দিয়েছেন। পিঁপড়া থেকে হাতি পর্যন্ত সকল জীব, এটম (পরমাণু) থেকে সূর্য পর্যন্ত সকল বস্তুই কতক নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে। এসব নিয়ম কে বানিয়েছেন? কোনো সৃষ্টি কি এসব নিয়ম নিজে বানাতে পারে? মানুষের শরীরে যত নিয়ম আছে-রক্ত চলাচলের নিয়ম, নিঃশ্বাস নেওয়ার নিয়ম, প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ম, ঘুমের নিয়ম ইত্যাদি কি মানুষ নিজেরা বানিয়ে নিয়েছে?

পশু-পাখি, গাছপালা, নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, ধুলা-বালি পর্যন্ত আল্লাহর বানানো নিয়ম মেনে চলছে। এদের কারো ঐ নিয়ম অমান্য করার শক্তি নেই। বস্তু হোক আর প্রাণীই হোক কেউ নিজের মর্জিমতো চলার ক্ষমতা রাখে না। স্বাধীনভাবে চলার সাধ্য থাকলে একই নিয়মে চলতে বাধ্য হতো না।

ইসলাম কাকে বলে?

এর সহজ উত্তর হলো— সৃষ্টির জন্য স্রষ্টা যে নিয়ম-কানুন বানিয়েছেন তারই নাম ইসলাম। যে সৃষ্টির জন্য যে নিয়ম তিনি দিয়েছেন তা-ই ঐ সৃষ্টির ইসলাম। সবার জন্য একই নিয়ম তিনি দেননি। যার জন্য যে নিয়ম দিয়েছেন সে নিয়মটাই তার ইসলাম।

মানুষের জন্য যে নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধান তিনি দিয়েছেন তা মানুষের ইসলাম। সূর্যের জন্য যে বিধান দেওয়া হয়েছে তা সূর্যের ইসলাম। পানির জন্য দেওয়া বিধান পানির ইসলাম। এভাবে ছোট-বড় সব জিনিস ও জীবেরই নিজস্ব ইসলাম রয়েছে।

ইসলাম দুরকম

মানুষের ইসলাম ও অন্যান্য সৃষ্টির ইসলামের মধ্যে দু’দিক দিয়ে অমিল আছে। যেমন—

১. মানুষের ইসলাম নবীর মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। অন্যান্য সৃষ্টির ইসলাম নবীর কাছে পাঠানো হয়নি। এমনকি মানুষের শরীরের জন্য যে ইসলাম তা-ও নবীর মাধ্যমে আসেনি। আল্লাহ তা‘আলা মানুষ ছাড়া অন্যান্য সৃষ্টির ইসলাম নবীর মাধ্যমে না পাঠিয়ে প্রত্যেক সৃষ্টির উপর তার জন্য তৈরিকৃত ইসলাম তিনি নিজে সরাসরি চালু করেন।

 

২. নবীর মাধ্যমে মানুষের জন্য যে ইসলাম পাঠানো হয়েছে তা আল্লাহ তা‘আলা মানুষের মধ্যে নিজে সরাসরি চালু করেন না। যদি তিনি সরাসরি চালু করতে চাইতেন, তাহলে নবী না পাঠিয়ে অন্যান্য সৃষ্টির ইসলামের মতোই মানুষের ইসলামও তিনি নিজেই জারি করতেন। তা না করে তিনি মানুষের ইসলাম নবীর কাছে পাঠিয়ে নবীকেই তা চালু করার দায়িত্ব দিয়েছেন। মানুষের ইসলাম আল্লাহ নিজে চালু করবেন না বলেই নবীর উপর সে দায়িত্ব দিয়েছেন।

এ দায়িত্বটাই খিলাফতের দায়িত্ব

ইসলাম আল্লাহর দেওয়া বিধান। তিনি নিজে তা জারি না করে তাঁর পক্ষ থেকে জারি করার দায়িত্ব নবীকে দিয়েছেন। কারো পক্ষ থেকে অন্য কেউ কোনো কাজ করলে তাকে প্রতিনিধি বা নায়েব বলা হয়। যার পক্ষ থেকে কাজটি করা হয় তিনি হলেন— মনিব বা মালিক। খলীফা বা প্রতিনিধি তো মালিক নয়; মালিকের মর্জিমতোই প্রতিনিধিকে কাজ করতে হয়। খলীফা বা প্রতিনিধির কাজটিকেই খিলাফত বলা হয়।

প্রতিনিধিকে আরবীতে খলীফা বলে। মানুষের জন্য আল্লাহ তা‘আলা যে ইসলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পাঠালেন তা তিনি খলীফা হিসেবে চালু করার দায়িত্ব রাসূল (সা.)-কেই দিলেন। আল্লাহ নিজে যখন জারি করবেন না, তখন জারি করার দায়িত্ব তো অন্য কাউকেই পালন করতে হবে।

আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে ঘোষণা করেছেন, ‘তিনি মানুষকে দুনিয়ায় খলীফার দায়িত্ব পালনের জন্যই পয়দা করেছেন।’ তাই যে ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর উপর ঈমান আনবে, তাকেও ঐ দায়িত্ব পালন করতে হবে। ঐ দায়িত্ব পালন না করলে কেউ-ই আল্লাহর খলীফা হিসেবে গণ্য হবে না।

এখানে একটা বড় কথা বুঝতে হবে— আল্লাহ মানুষকে শুধুমাত্র খলীফা হিসেবেই পাঠিয়েছেন। তাই দুনিয়ায় মালিক বা মনিব হওয়ার কোনো ক্ষমতা মানুষের নেই। যদি কোনো মানুষ আল্লাহর খলীফার দায়িত্ব পালন করতে না চায়, তাহলে সে যা করবে তাতে সে শয়তানের খলীফা বলেই গণ্য হবে। কারণ, আল্লাহর বিধান যে পালন করে না, সে অন্য যে বিধানই মেনে চলে, তা শয়তানের বিধান হিসেবেই কুরআন মাজীদের সূরা আল বাকারা ২০৮ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে। দুনিয়ায় মানুষকে খলীফাই হতে হবে; অন্য কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। হয় আল্লাহর খলীফা, আর না হয় শয়তানের খলীফা।

মানুষের জন্য জ্ঞান জরুরি

জ্ঞান মানে জানার বিষয়। মানুষ ও জিন ছাড়া অন্য যত জীব আছে, তাদের যা কিছু জানা দরকার সেজন্য নিজেদের চেষ্টা করা লাগে না। আল্লাহ তাদের জন্য যে নিয়ম-কানুন বানিয়েছেন তা তিনি নিজেই তাদেরকে শিখিয়ে দেন। তাই তাদেরকে চেষ্টা করে কিছুই শিখতে হয় না। তাদের জন্য কোন্‌টা দরকার, কোন্‌টা ভালো ও কোন্‌টা মন্দ— এর কোনোটাই অন্যদের কাছ থেকে জানতে হয় না। মানুষকে চেষ্টা করে সাঁতার শিখতে হয়। হাঁসকে আল্লাহ তা‘আলা জন্মগতভাবেই সাঁতার শিখিয়ে দেন।

মানুষকে নিজের ইচ্ছামতো সবকিছু করতে হয়। তাকে জানতে হয় যে, কোন্‌টা কীভাবে কখন করা দরকার। তাকে নিজের ইচ্ছার ফায়সালা করতে হয় যে, সে আল্লাহর খলীফা হতে চায়, নাকি শয়তানের খলীফা। খিলাফতের এ ইখতিয়ার থাকার কারণেই তাকে নিজের ইচ্ছায় সবকিছু জানার চেষ্টা করতে হয়।

কুকুর মানুষের পায়খানাও খায়; কিন্তু কুকুরের বাচ্চা কখনো নিজের পায়খানা মুখে নেয় না। মানব-শিশু জানার অভাবে নিজের পায়খানাও মুখে দিতে পারে। তাই মানুষকে বাধ্য হয়ে জ্ঞান হাসিল করার চেষ্টা করতে হয়।

জ্ঞানের মূল উৎস কী কী

জ্ঞান তো তালাশ করতেই হবে। কোথা থেকে তা পাওয়া যায় তাও তো জানা জরুরি। যেখান থেকে জ্ঞান হাসিল করা যায় তাকেই জ্ঞানের উৎস বলে। কোন্‌ কোন্‌ উৎস থেকে জ্ঞান যোগাড় করতে হবে সর্বাগ্রে তা জানা দরকার। জ্ঞানের উৎস চারটি। যথা— ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি, ইলহাম ও ওহী। এ উৎসগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা খুবই জরুরি।

ইন্দ্রিয়: চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও চামড়া— পাঁচটির সাহায্যে মানব-শিশু পয়লা জ্ঞান লাভ করে। এটা হলো সরাসরি জ্ঞান। যা দেখা যায়, শোনা যায়, যার গন্ধ পাওয়া যায়, স্বাদ নেওয়া যায় তা সবই সরাসরি জ্ঞান।

বুদ্ধি: ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে সামান্য জ্ঞানই হাসিল করা যায়। মানুষ বুদ্ধির সাহায্যেই সবচেয়ে বেশি জ্ঞান পায়। বুদ্ধি মানে যুক্তি বা কার্যকারণ। যেমন, চোখ দূরে কোথাও ধোঁয়া দেখতে পেল। বুদ্ধি বলে দিল, সেখানে আগুন লেগেছে; চোখের আগুন দেখার প্রয়োজন হয়নি। যুক্তি বলে দিল যে, আগুন হলেই ধোঁয়া হয়। তাই আগুন না দেখেও বুদ্ধি বলে দিল, আগুন লেগেছে। আরবীতে বুদ্ধিকে ‘আক্‌ল’ বলে।

ইলহাম: ইলহাম শব্দটি আরবী। সহজ বাংলায় এর অর্থ পাওয়া গেল না। ইংরেজিতে এ উৎসটিতে Intuition বলা হয়। এর অর্থ অভিধানে লেখা হয়েছে ‘স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞান’। যে জ্ঞান চেষ্টা-সাধনা ও গবেষণা করা ছাড়া হঠাৎ পাওয়া যায়। অবশ্য এ রকম জ্ঞান তারাই পায়, যারা চিন্তা-সাধনা করে। কবি, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, ইসলামী গবেষক ও চিন্তাবিদগণ কোনো কোনো সময় এমন বিষয়েও ইলহামী জ্ঞান পান, যে বিষয়ে তাঁরা চেষ্টা-সাধনা করেননি।

ওহী: আল্লাহর নিকট থেকে নবী-রাসূলগণের নিকট যে জ্ঞান আসে, তাকেই ওহীর জ্ঞান বলা হয়। ওহীর জ্ঞান আল্লাহর নিজের ভাষায়ও আসতে পারে। যেমন— কুরআন মাজীদের ভাষা। নবী-রাসূলের মনে আল্লাহ তা‘আলা ভাষা ছাড়াও জ্ঞান বা বুঝ দেন, যা তাঁরা নিজের ভাষায় প্রকাশ করেন। নবী-রাসূলগণ নিজের মনগড়া জ্ঞান দান করেন না। তাঁরা যে জ্ঞান দান করেন তা ভাষাসহ বা ভাষাছাড়া আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। এ জ্ঞানই হলো ওহীর জ্ঞান।

 

জ্ঞানের এ চার রকমের উৎসের মধ্যে একমাত্র ওহীর জ্ঞানেই কোনো ভুল থাকে না। আল্লাহর তো ভুল হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই আল্লাহর কাছ থেকে নবীর নিকট আসা জ্ঞানও অবশ্যই নির্ভুল। কিন্তু বাকি তিনটি উৎস থেকে পাওয়া জ্ঞান শুদ্ধও হতে পারে, ভুলও হতে পারে। তাই ঐ তিনটির সাহায্যে পাওয়া জ্ঞান ওহীর জ্ঞানের মাপকাঠিতে যাচাই করেই জানতে হবে— কোন্‌টা শুদ্ধ এবং কোন্‌টা ভুল। ওহীর জ্ঞানই শুদ্ধ ও অশুদ্ধ চেনার একমাত্র মাপকাঠি।

ইসলাম কবুল করার নিয়ম

কোনো লোক যদি ইসলাম কবুল করতে চায় তাহলে তাকে কয়েকটি নিয়ম পালন করতে হয়। সে মুসলিম পরিবারে পয়দা হলেও তাকে এসব নিয়ম মানতে হবে; তা না হলে আল্লাহর দরবারে মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে না।

‘ইসলাম’ শব্দ থেকেই ‘মুসলিম’ শব্দ তৈরি হয়েছে। যে ইসলাম কবুল করল সে-ই মুসলিম হলো। ইসলাম মানে আত্মসমর্পণ। মুসলিম মানে যে আত্মসমর্পণ করল বা আত্মসমর্পণকারী। ‘মুসলিম’ আরবী শব্দ। ফারসি ভাষায় মুসলমান বলা হয়।

সঠিকভাবে ইসলাম কবুল করতে হলে—

১. প্রথমেই মনে মনে ফায়সালা করতে হবে যে, আমি আমার মর্জিমতো চলব না; যা করলে আল্লাহ খুশি হন তা-ই করব।

২. এরপর বুঝে-শুনে কালেমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করতে হবে— ‘আশহাদু আল্‌ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহূ ওয়া রাসূলুহূ।’ এর তরজমা হলো, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মা‘বুদ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।’ ইলাহ ও মা’বুদ মানে হুকুমকর্তা, প্রভু বা মনিব।

‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ কথাটি কালেমায়ে তাইয়েবা নামে পরিচিত। কালেমা মানে কথা। তাইয়েবা মানে পবিত্র। কালেমা তাইয়েবা মানে পবিত্র কথা।

৩. এ কালেমার অর্থ ভালোভাবে বুঝতে হবে। না বুঝে শুধু কালেমা উচ্চারণ করলেই চলবে না। কারণ, কোনো শব্দের অর্থটাই আসল; শব্দটা আসল নয়। যেমন— ‘আগুন’ একটা শব্দ। এ শব্দের মধ্যে আগুন নেই। আগুন একটা জিনিস। ‘আগুন’ শব্দ বলে আমরা ঐ জিনিসকেই বুঝি। কালেমা তাইয়েবার মধ্যে যে ক’টি শব্দ আছে, এগুলোর অর্থই আসল। তাই ঐ শব্দগুলো উচ্চারণ করার সময় যে অর্থ বুঝতে হবে তা-ই হলো আসল কালেমা।

৪. কালেমা তাইয়েবার অর্থ

ক. ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ কথাটি উচ্চারণ করে ঘোষণা করা হয় যে, ‘আমি শুধু আল্লাহর হুকুম মেনে চলব; তাঁর হুকুমের বিরোধী কারো হুকুম মানব না।’

খ. ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ কথাটি উচ্চারণ করে ঘোষণা করা হয় যে, ‘মুহাম্মদ (সা.) যে নিয়মে আল্লাহর হুকুম পালন করেছেন, আমি ঠিক সে নিয়মেই পালন করব; অন্য কারো নিকট থেকে কোনো নিয়ম কবুল করব না।

আসল কথা হলো, কালেমা তাইয়েবা এমন কোনো মন্ত্র নয় যে, না বুঝে শুধু উচ্চারণ করলেই বেহেশতে যাওয়া যাবে। এ কালেমা হলো জীবনে চলার ২ দফা নীতি বা পলিসি। ঐ দুটো কথা উচ্চারণ করে ২ দফা নীতি ঘোষণা করা হয়, যা আসলে সরাসরি আল্লাহর সাথে ২ দফা ওয়াদা। যে এ ক’টি নিয়ম পালন করে সে-ই ইসলাম কবুল করে মুসলিম হয়ে যায়।

মুসলিমের করণীয় কী?

মানুষ হিসেবে দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে হলে যা কিছু করতে হয় সেসবই মুসলিম হওয়ার পর আল্লাহ তা‘আলার হুকুম ও রাসূল (সা.)-এর শেখানো নিয়মে করতে হবে। কারণ, কালেমা তাইয়েবার মাধ্যমে জীবনে চলার যে দুই দফা নীতি ঘোষণা করা হয়েছে, এর দাবি এটাই। এ নিয়মে চলার জন্যই আল্লাহ তা‘আলার সাথে ওয়াদা করা হয়েছে।

এক দিনের ২৪ ঘন্টায় আমরা যা করি তা শুরু হয় সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়। রাসূল (সা.) কী নিয়মে ঘুম থেকে উঠেছেন এবং ওঠার পরে কী নিয়মে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করেছেন, তা জেনে সে নিয়মেই এসব করতে হবে। তিনি যে নিয়মে ওযূ করেছেন এবং নামায আদায় করেছেন সে নিয়মেই আমাদেরকে করতে হবে।

এভাবে সারাদিন যা কিছু করতে হয়, সবই আল্লাহ তা‘আলার হুকুম ও রাসূল সা. এর শেখানো নিয়মে করতে হবে। খাওয়া-দাওয়া, আয়-রোজগার, ব্যবসা-বাণিজ্য করা ইত্যাদি সবই আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের তরীকা বা নিয়মমতো করতে হবে। রাতে ঘুমানোর সময়ও রাসূলের শেখানো নিয়মে ঘুমাতে হবে।

নামায আল্লাহকে ভুলতে দেয় না

আল্লাহ তা‘আলা সূরা তোয়াহা’র ১৪ নং আয়াতে বলেন,

وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي

অর্থাৎ ‘আমাকে মনে রাখার জন্য নামায কায়েম কর।’

মসজিদে জামাআতের সাথে আদায় করাই নামাযের সঠিক নিয়ম। জামাআতে হাজির হওয়ার চেষ্টা না করে সবসময় ফরয নামায একা একা পড়ার অভ্যাস করলে এ নামায আল্লাহর দরবারে কবুল নাও হতে পারে। কোনো কারণে জামাআতে ফরয নামায আদায় করতে না পারলে তো ঐ নামায বাধ্য হয়ে একাকীই পড়তে হবে; কিন্তু জামাআতে নামায আদায় করার জন্য রাসূল সা. কঠোর তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার ইচ্ছা হয় যে, অন্য একজনকে নামাযে ইমামতি করতে দিয়ে আমি (মহল্লায়) ঘুরে দেখি— কারা জামাআতে আসল না; এরপর ঐ সব লোকের ঘর পুড়িয়ে দিই, যারা জামায়াতে হাজির হলো না।’

 

রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, মসজিদে নামায আদায় করলে কমপক্ষে ২৭ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে। আর ফরয নামায ছাড়া বাকি নামায বাড়িতে পড়লে বেশি সওয়াব। তিনি আরও বলেন, ‘হাশরের দিন যখন আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া কোনো ছায়া থাকবে না, তখন সাত রকম মানুষ ঐ ছায়ায় আশ্রয় পাবে। তাদের একজন ঐ লোক, যার দিল মসজিদের দিকে ঝুলে থাকে।’

এর অর্থ হলো— সে মসজিদে নামায আদায় করার পর বাইরে যখন কাজকর্মে ব্যস্ত থাকে তখনও তার মনটা মসজিদমুখী থাকে এবং কখন আযান হয় সেদিকে খেয়াল রাখে ও সময়মতো জামাআতে হাজির হয়।

নামায তাকে সবসময় মনে করিয়ে দেয় যে, তুমি সবসময়ই আল্লাহর গোলাম। তুমি আল্লাহ যা অপছন্দ করেন তা করতে পার না। এভাবেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায যে মসজিদে জামাআতে আদায় করার অভ্যাস করে নেয়, সে আল্লাহকে ভুলে থাকতে পারে না।

একজন নামাযীর ২৪ ঘন্টা

একজন খাঁটি নামাযীর দিনের ২৪ ‍ঘন্টার কাজ শুরু হয় নামায দিয়ে, শেষও হয় নামায দিয়ে। ঘুম থেকে ওঠার পরে নামাযের আগে আর কোনো কাজ নেই। পেশাব-পায়খানা ও ওযূ-গোসল তো নামাযের জন্য প্রস্তুতি হিসাবেই করতে হয়। ইশার নামায পড়ে আবার ঘুমিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দিনের কাজ শেষ হয়। রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ইশার নামায জামাআতের সাথে আদায় করার পর ঘুমিয়ে গেল আবার ফজরের জামাআতে শামিল হলো, তার আমলনামায় ঘুমকেও ইবাদাত হিসেবে লেখা হবে।’

চার ওয়াক্ত নামায সময়ের শুরুতে আদায় করলে বেশি সওয়াব হয়; কিন্তু ইশার নামায রাতের তিন ভাগের এক ভাগ পার হওয়ার পর পড়লে বেশি সওয়াব। এর উদ্দেশ্য একটাই, যাতে ইশার নামাযের পর তাড়াতাড়ি ঘুমানো যায়। যাতে নামাযে মনটা যে অবস্থায় থাকে, ঐ অবস্থায়ই ঘুমিয়ে পড়া যায়।

এ কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, খাঁটি নামাযীর ২৪ ঘন্টার রুটিন নামাযের অধীন থাকবে; নামায অন্য কাজের অধীন থাকবে না। যেমন— কোনো কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে নামাযের সময় মসজিদে না গিয়ে যদি পরে একা নামায পড়া হয় তাহলে নামাযকে কাজের অধীন করা হলো। নামাযের সময় হয়ে গেলে কাজকে মুলতবি করে নামাযে যেতে হবে। তবেই রুটিন নামাযের অধীন হবে।

রোযা নাফ্‌সকে দমন করার হাতিয়ার

আল্লাহ তা‘আলা সব মানুষকেই কোন্‌টা ভালো আর কোন্‌টা মন্দ, তা বোঝার যোগ্যতা দিয়েছেন। এরপরও মানুষ কেমন করে মন্দ কাজ করে? মানুষের রূহ যদি দুর্বল থাকে তাহলে নাফ্‌সের তাড়নায় মানুষ মন্দ কাজ করে। দেহের দাবিকে নাফ্‌স বলা হয়। দেহের নৈতিক চেতনা নেই বলেই দেহ মন্দ কাজের দিকে টানে। এ সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো— রূহকে এমন শক্তিশালী করা, যাতে সে নাফ্‌সকে দমন করতে পারে। নামাযও নাফ্‌সকে দমন করতে সাহায্য করে। যেমন, শীতের মৌসুমে শরীরটা ফজরের সময় লেপ ছেড়ে উঠতে চায় না। কিন্তু নামাযের অভ্যাস হলে রূহের এতটা শক্তি হয় যে, শরীর বা দেহকে লেপ ছেড়ে উঠতে বাধ্য করতে পারে।

আল্লাহ তা‘আলা নাফ্‌সকে দমন করে এর উপর রূহকে বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে রোযাকে সবচেয়ে মযবুত হাতিয়ার হিসেবে দিয়েছেন।

দেহের দাবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কড়া দাবি হলো— পেটের ক্ষুধা ও যৌনক্ষুধা। পেটে বেশি ক্ষুধা লাগলে মানুষ অস্থির হয়ে যা পায় তা-ই খায়। কঠিন পিপাসা লাগলে পানির জন্য পাগল হয়ে যায়। যৌনক্ষুধা যখন তীব্র হয় তখন হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। ধর্ষণের মত খবর পত্রিকায় দেখা যায়, তা ওই যৌনক্ষুধারই ফল।

রমযান মাসের রোযা ওই রোগেরই আসল ওষুধ। রমযানে দিন শরু হওয়ার আগে থেকে সূর্য ডোবার সময় পর্যন্ত পানাহার ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকতে হয়। পেটের ক্ষুধা ও যৌনক্ষুধার মতো তীব্র দুটো ক্ষুধাকে দমন করতে পারলে নাফ্‌সের অন্য সব দাবিকে দমন করা সহজ হওয়ারই কথা।

গরমের মৌসুমে রাতের চেয়ে দিন অনেক বড় থাকে। দুপুরের পরে খুব ক্ষুধা লাগে। কোনো কোনো সময় খুব পিপাসা লাগে। কিন্তু যে রোযা রাখে সে ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট সহ্য করে নাফ্‌সকে দমন করে। এভাবে তার রূহের শক্তি বেড়ে যায়।

রোযা ছাড়া এত লম্বা সময় একটানা কিছুই না খেয়ে কেউ থাকে না। তাই শেষবেলায় ভয়ানক ক্ষুধা লাগে। ক্ষুধার জ্বালা কেমন, তা ধনীরা রোযার মাধ্যমে টের পায়। আল্লাহ তা‘আলার হুকুম ও রাসূল (সা.)-এর তরীকা পালনের ওয়াদা করে যারা মুসলিম হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা কখনও রোযা অবস্থায় গোপনে কিছু খেয়ে ফেলে না। আর কেউ না দেখলেও আল্লাহ যে দেখছেন, সে চেতনার কারণেই এভাবে ভুখ-পিপাসায় কষ্ট পেলেও তা তারা সহ্য করে। রমযানের গোটা মাসটায় একটা কঠিন ট্রেনিং চলে। আল্লাহকে খুশি করার জন্য দেহের দাবিকে অগ্রাহ্য করে যারা রোযা রাখে তাদের নৈতিক শক্তি বেড়ে যায়। নাফ্‌সকে দমন করার এ ট্রেনিং মানুষকে নাফ্‌সের গোলাম হওয়া থেকে বাঁচায় এবং আল্লাহর গোলাম হওয়ার যোগ্য বানায়।

একটা কথা ভালো করে বুঝে নেওয়া দরকার, আল্লাহ রোযাদারকে অনেক বেশি সময় ভুখা রেখে কষ্ট দিতে চান না। তাই শেষরাতে দেরি করে খেলে সওয়াব বেশি। ফজরের সময় শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত খাওয়া যায়। ওদিকে সূর্য ডোবার সাথে সাথে দেরি না করে ইফতার করলে সওয়াব বেশি। ক্ষুধায় বেশি সময় কষ্ট দেওয়া আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়।

রোযার হুকুম দিয়ে আল্লাহ রোযাদারকে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তুমি নাফ্‌সের গোলাম না হয়ে আমার গোলাম হও। আমি যখন খেতে বলি তখন খাও; যখন খাওয়া বন্ধ করতে বলি তখন বন্ধ করো। তোমার দেহ যখন খেতে চায় তখনই খেতে দেবে না। দেহ দিনের বেলায়ও খেতে চাইতে পারে।

ক্ষুধা মানে খাওয়ার ইচ্ছা। রোযার সময় দুপুরের পর দেহ খেতে চায়; কিন্তু রোযাদার তখন খেতে দেয় না। ভাবখানা এমন যে, আমি আল্লাহর গোলাম; তোর গোলাম নই। আমার মনিবের হুকুমমতো বেলা ডোবার পর খেতে দেব, এর আগে নয়।

এভাবে রোযার মাধ্যমে দেহের দাবিকে অগ্রাহ্য করে আল্লাহর হুকুম পালন করার অভ্যাস হয়। রোযাদার নাফ্‌সকে রূহের অধীনে আনার যোগ্য হয়। নামায ও রোযা এমন চমৎকার ট্রেনিং, যা মানুষকে কালেমার ওয়াদা অনুযায়ী চলার যোগ্য বানায়।

যাকাত ও হজ্জ

আল্লাহ যেসব খারাপ কাজ করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকতে টাকা-পয়সা লাগে না; কিন্তু ঐ নিষিদ্ধ কাজগুলো করতে অনেক খরচ করা লাগে। মদ-জুয়া, যিনা, নাচ-গান ও অন্যান্য ফাহেশা কাজের দিকে নাফ্‌সের সাংঘাতিক ঝোঁক। এসবই আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করেছেন। যাদের টাকা-পয়সা বেশি আছে তাদেরই এসব মন্দ কাজ করার সুযোগ হয়।

তাই ধনী লোকদেরকে কালেমার ওয়াদামতো চলার যোগ্য বানানোর জন্য নামায ও রোযা যথেষ্ট নয়। তাদেরকে নাফসের গোলামি থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর যাকাত ও হজ্জ ফরয করেছেন। যাকাতের আসল উদ্দেশ্য হলো সমাজের গরীব লোকদের অভাব দূর করা। যাকাত ধনবানকে শেখায় যে—

১. ধনের আসল মালিক আল্লাহ। তাই হালাল পথে আয় করতে হবে। কারণ, যাকাত হালাল মাল থেকেই দিতে হয়।

২. আল্লাহর হুকুমমতো যাকাত আদায়ের পর ধনীর হাতে যে মাল থাকে তা যেমন-খুশি তেমন খরচ করা চলবে না; এর আসল মালিকের মর্জিমতো খরচ করতে হবে।

হজ্জের উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর মহব্বতে দুনিয়ার সবকিছু কুরবানী দেওয়ার জযবা পয়দা করা। হজ্জের সময় সেলাইছাড়া দু‘টুকরা কাপড় পরে অতি দীনহীনভাবে আল্লাহর প্রেমে পাগলপারা হতে হয়। হজ্জ ধনীকে শেখায় যে—

১. ধন বেশি আছে বলেই বিলাসিতা করে ‘ননীর পুতুল’ হয়ে যেও না। হজ্জ করার কষ্ট সহ্য করার যোগ্য হও।

২. যত বড় লোকই হয়ে থাক, সেলাইবিহীন দু’টুকরা কাপড় পরে মক্কা, মিনা ও আরাফাতে আল্লাহপ্রেমিকদের সাথে এক হয়ে নিজের বড়ত্ব ভুলে যাও।

৩. আরাফাতের ময়দানে মহান মনিবের সামনে মাথা নত করে অপরাধীর মতো দাঁড়াও, ধনের অহঙ্কার বাদ দাও। তুমি রাজা-বাদশাহ, শাসন বা বড় কর্তা যা-ই হয়ে থাক— এ কথা খেয়ালে রাখ যে, মরার পর তোমার গায়ের দু’টুকরা কাপড়ের মতো কাফন পরিয়েই তোমাকে কবরে রাখা হবে। তোমার ধন ও মান কোনোটাই সাথে যাবে না।

এভাবে যাকাত ও হজ্জ ধনীদেরকে যা শেখায় যদি তারা তা খেয়ালে রাখে, তাহলে তাদের ধন থাকা সত্ত্বেও তারা কালেমার ওয়াদা পালন করে চলতে পারবে। ধন আছে বলেই নাফ্‌সের গোলাম হবে না; আল্লাহর গোলাম হওয়ার যোগ্যই থাকবে।

ইসলামের পাঁচটি ভিত্‌

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ইসলাম পাঁচটি ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত—

১. এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর বান্দাহ ও রাসূল,

২. নামায কায়েম করা,

৩. যাকাত আদায় করা,

৪. হজ্জ,

৫. রমযানের রোযা।’ (বুখারী ও মুসলিম)

কোনো দালান তৈরি করতে হলে প্রথমে এর ভিত বা বুনিয়াদ গড়তে হয়। ওই বুনিয়াদের উপর দেয়াল তোলা হয়। দেয়ালের উপর ছাদ তৈরি করা হয়। ভিত মযবুত না হলে দেয়াল ও ছাদ টেকে না। তাই দালানের জন্য মযবুত ভিতই পয়লা জরুরি।

শুধু ভিতটুকুই দালান নয়, দেয়াল ও ছাদ মিলেই দালান। ঠিক তেমনি ইসলামের ভিত হলো এ পাঁচটি— কালেমা, নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত। এ ভিতগুলো মযবুত হলে ইসলামের দালানও মযবুত হবে। তাই এ পাঁচটি ভিত সম্পর্কে এত লম্বা আলোচনা করলাম।

কিন্তু এই পাঁচটি ইসলামের দালানের ভিত মাত্র। রাসূল (সা.) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার কায়েম করে ইসলামের পুরা দালান তৈরি করেছিলেন। পরিবার, সমাজ আইন, শাসন, বিচার ব্যাবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি সবই তিনি কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী গড়ে তুলেছিলেন। তিনি ইসলামের দালান পুরোপুরি কায়েম করে সবচেয়ে শান্তির সমাজ ও দেশ হিসেবে মদীনাকে দুনিয়ার মানুষের সামনে প্রমাণ করেছিলেন।

আমরা এ পর্যন্ত ইসলামের ভিত সম্পর্কে জানলাম। ইসলামের গোটা দালান সম্বন্ধে আমাদেরকে ভালো করে জানতে হবে।

অধ্যাপক আবু নোমান

 

Facebook Comments