ইসলামের মৌলিক বুনিয়াদ: ঈমান

ইসলামী আকীদাহ

মানুষের প্রকৃতি ও মানবজাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, সঠিক বিশ্বাসই মানুষের সকল সফলতা ও সৌভাগ্যের ভিত্তি। বিশ্বাসই মানুষের পরিচালিকা শক্তি। সঠিক বিশ্বাস মানুষকে মানবতার শিখরে তুলে দেয় এবং তার জীবনে বয়ে আনে অফুরন্ত শান্তি ও আনন্দ।

আমরা জানি, বিশ্বাস ও কর্মের সমন্বয়ে ইসলাম। সঠিক বিশ্বাস বা ঈমানই ইসলামের মূল ভিত্তি। আমরা যত ইবাদত ও সৎকর্ম  করি সবকিছু আল্লাহর নিকট কবুল বা গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত ঈমান।

ঈমানের স্তম্ভসমূহ

‘মুমিন’ বা ঈমানদার হিসেবে গণ্য হতে একজন মানুষকে কী কী বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে তা মহান আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া রাসূলের সুন্নাহ বা হাদীসেও বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইসলামের পরিভাষায় এগুলিকে ‘আরকানুল ঈমান’ বা ঈমানের স্তম্ভ বলা হয়।

মহান আল্লাহ বলেন:

لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآَخِرِ وَالْمَلائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآَتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآَتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

‘পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোর মধ্যে কোনো পুণ্য নেই। কিন্তু পুণ্য তার যে বিশ্বাস স্থাপন করেছে আল্লাহর প্রতি, পরকালের প্রতি, ফেরেশতাগণের প্রতি, কিতাবসমূহে ও নবীগণের প্রতি এবং ধন-সম্পদের প্রতি মনের টান থাকা সত্ত্বেও আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন-অনাথ, অভাবগ্রস্ত, পথিক, সাহায্য প্রার্থনাকারীগণকে ও দাসমুক্তির জন্য অর্থ ব্যয় করে, এবং সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে, প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূর্ণ করে আর অর্থ-সংকটে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য্য ধারণ করে। এরাই প্রকৃত সত্যপরায়ণ এবং এরাই মুত্তাকী।’ [সূরাহ বাকারা: ১৭৭]

এখানে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন যে, শুধু আনুষ্ঠানিকতার নাম ইসলাম নয়, প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতায় কোনো পুণ্য নেই। ইসলাম বিশ্বাস ও কর্মের সমন্বয়।

এখানে আল্লাহ মুমিনের বিশ্বাসের মৌলিক পাঁচটি বিষয় এবং তার মৌলিক কর্ম ও চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। অন্যত্র আল্লাহ বলেন:

آَمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آَمَنَ بِاللَّهِ وَمَلائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ

‘রাসূল তাঁর প্রতি তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। তারা সকলেই আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহে এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য করি না।’ [সূরাহ বাকারা: ২৮৫]

এখানে ঈমানের স্তম্ভগুলির মধ্য থেকে ৪টি বিষয় উল্লে¬খ করা হয়েছে। অন্য আয়াতে ৫টি বিষয়ের উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا آَمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآَخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالا بَعِيدًا

‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূলের ওপর আর যে গ্রন্থ তাঁর রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন তার ওপর এবং যেসব গ্রন্থ তিনি পূর্বে অবতীর্ণ করেছেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করো। অতঃপর কেউ আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর গ্রন্থসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং আখিরাতকে অবিশ্বাস করলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে।’ [সূরাহ নিসা: ১৩৬]

এভাবে কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে উপরের বিষয়গুলি একত্রে বা পৃথকভাবে উল্লে¬খ করা হয়েছে। বিভিন্ন হাদীসেও ঈমানের রুকন বা স্তম্ভগুলি উল্লে¬খ করা হয়েছে। ঈমানের পরিচয় দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘(ঈমান এই যে,) তুমি বিশ্বাস করবে আল্লাহয়, তাঁর ফেরেশতাগণে, তাঁর কিতাবসমূহে, তাঁর সাক্ষাতে, তাঁর রাসূলগণে; তুমি বিশ্বাস করবে শেষ পুনরুত্থানে এবং তুমি বিশ্বাস করবে তাকদীর বা নির্ধারিত বিষয়সমূহে।’ [সহীহুল বুখারী: ১/২৭, ৪/১৭৩৩; সহীহ মুসলিম: ১/৩৯, ৪০, ৪৭]

এই ঘটনারই বর্ণনা করেছেন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) অন্য এক হাদীসে। তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বসে ছিলাম। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি সেখানে আসলেন। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ অত্যন্ত ধবধবে সাদা এবং মাথার চুলগুলো অত্যন্ত পরিপাটি ও কাল।.. তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ঈমান সম্পর্কে প্রশ্ন করে বলেন, ঈমান কী তা আমাকে বলুন। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّه

‘ঈমান হলো এই যে, তুমি বিশ্বাস করবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহে, তাঁর রাসূলগণে ও শেষ দিবসে (আখিরাতে) এবং বিশ্বাস করবে আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের (ভাগ্যের) ভাল ও মন্দে।’ [সহীহ মুসলিম: ১/৩৫-৩৬]

এভাবে বিভিন্ন আয়াত ও হাদীসের আলোকে আমরা জানতে পারি যে, ইসলামের মৌল বিশ্বাস বা ‘আল-আকীদাহ আল ইসলামিয়্যাহ’-র ছয়টি মৌলিক স্তম্ভ রয়েছে—

১. আল্লাহর ওপর ঈমান,

২. আল্লাহর ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান

৩. আল্লাহর নাযিল করা কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান,

৪. আল্লাহর রাসূলগণের ওপর ঈমান,

৫. পুনরুত্থান, কিয়ামত, পরকাল বা আখিরাতের ওপর ঈমান, এবং

৬. তাকদীর বা আল্লাহর নির্ধারণ ও সিদ্ধান্তের ওপর ঈমান। এ বিষয়গুলোকে আরকানুল ঈমান, অর্থাৎ ঈমানের স্তম্ভসমূহ, ভিত্তিসমূহ বা মূলনীতিসমূহ বলা হয়।

আল্লাহর প্রতি ঈমান

আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্থ আল্লাহর একত্বে বা তাওহীদে বিশ্বাস করা। বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর প্রতি ঈমানের বর্ণনা দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

بُنِيَ الإِسْلامُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ- وفي رواية: شَهَادَةِ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، وفي رواية ثالثة: أَنْ يُوَحَّدَ اللَّهُ، وفي أخرى: أَنْ يُعْبَدَ اللَّهُ وَيُكْفَرَ بِمَا دُونَهُ- وَإِقَامِ الصَّلاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَالْحَجِّ وَصَوْمِ رَمَضَانَ، وفي رواية: صيام رمضان والحج

‘ইসলামকে পাঁচটি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, তা হলো— বিশ্বাসের সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ বা উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, (অন্য বর্ণনায় রয়েছে: একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং আল্লাহ ছাড়া যা কিছু (উপাস্য) আছে সবকিছুকে অবিশ্বাস করা), সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রামাদান মাসের সিয়াম (রোযা) পালন করা, বাইতুল্লাহর হজ্জ আদায় করা।’ [সহীহ বুখারী: ১/১২, ৪/১৬৪১; সহীহ মুসলিম: ১/৪৫]

আনাস ইবনু মালিক (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

مَا مِنْ عَبْدٍ يَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ إِلا حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ

‘যে কোনো ব্যক্তি যদি সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ বা উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসূল, তবে তাঁর জন্য আল্লাহ জাহান্নামের আগুন হারাম বা নিষিদ্ধ করে দেবেন।’ [সহীহ বুখারী: ১/১২, ৪/১৬৪১; সহীহ মুসলিম: ১/৪৫]

তাওহীদের অর্থ ও সংজ্ঞা

‘তাওহীদ’ শব্দটি আরবী ‘ওয়াহাদা’ (وَحَدَ) ক্রিয়ামূল থেকে গৃহীত, যার অর্থ ‘এক হওয়া’, ‘একক হওয়া’ বা ‘অতুলনীয় হওয়া’ (to be alone, unique, singular, unmatched, without equal, incomparable)। তাওহীদ অর্থ ‘এক করা’, ‘এক বানানো’, ‘একত্রিত করা’, ‘একত্বের ঘোষণা দেওয়া’ বা ‘একত্বে বিশ্বাস করা’। তাওহীদের ব্যবহারিক অর্থের ব্যাখ্যা প্রদান করে কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফে অগণিত নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, যেগুলি আমরা এ অধ্যায়ে আলোচনা করব। প্রথমেই আমরা পূর্ববর্তী হাদীসে উল্লি¬খিত তাওহীদের পরিচিতি আলোচনা করব।

আমরা দেখেছি যে, উপরের হাদীসগুলিতে তাওহীদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: (لا إله إلا الله) ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ বা উপাস্য নেই।’ বিভিন্ন বর্ণনায় এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে: (وحده لا شريك له) ‘তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই।’ আমরা প্রথমে এ বাক্যটির বিভিন্ন শব্দের অর্থ বুঝার চেষ্টা করব।

আরবীতে لا শব্দের অর্থ হলো— নেই, মোটেও নেই বা একেবারে নেই। এই বাক্যে শব্দটি نفي الجنس বা মোটেও নেই বা একেবারেই নেই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

إله শব্দের অর্থ হলো ‘মা‘বুদ’, অর্থাৎ উপাস্য বা পূজ্য, যার কাছে মনের আকুতি পেশ করা হয়, প্রয়োজন মেটানোর জন্য সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। ৪র্থ হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ ভাষাবিধ ও অভিধান-প্রণেতা আবুল হুসাইন আহমদ ইবনু ফারিস (মৃত্যু ৩৯৫ হি.) বলেন:

الهمزة واللام والهاء أصل واحد، وهو التعبد. فالإله الله تعالى، وسمي بذلك لأنه معبود

‘হামযা, লাম ও হা = ইলাহ: ধাতুটির একটিই মূল অর্থ, তা হলো— ইবাদত করা। আল্লাহ ইলাহ কারণ তিনি মা‘বুদ বা ইবাদতকৃত।’ [ইবনু ফারিস, মু‘জামু মাকাইসুল¬ লুগাহ ১/১২৭]

আরবী ভাষায় সকল পূজিত ব্যক্তি, বস্তু বা দ্রব্যকেই ‘ইলাহ’ বলা হয়। এজন্য সূর্যের আরেক নাম ‘ইলাহাহ’ (الإلاهة); কারণ কোনো কোনো সম্প্রদায় সূর্যের উপাসনা বা পূজা করত। [ইবনু ফারিস, মু‘জামু মাকাইসিল লুগাহ ১/১২৭; রাগিব ইসফাহানী, আল-মুফরাদাত, পৃ. ২১।

মহান আল্লাহ বলেন:

وَقَالَ الْمَلأُ مِنْ قَوْمِ فِرْعَوْنَ أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الأَرْضِ وَيَذَرَكَ وَآَلِهَتَكَ

‘ফিরাউন সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বলল, আপনি কি মূসাকে এবং তার সম্প্রদায়কে রাজ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে এবং আপনাকে ও আপনার উপাস্যদেরকে বর্জন করতে দিবেন?’ [সূরাহ আ‘রাফ: ১২৭ আয়াত]

ইবনু আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি এখানে ‘আলিহাতাকা’ (آلِهَتَكَ) স্থলে ‘ইলাহাতাকা’ (إلاهَتَك) পড়তেন। ‘ইলাহাত’ অর্থ ইবাদত, অর্থাৎ আপনি কি তাদেরকে আপনাকে ও আপনার ইবাদত করা বর্জন করতে দিবেন? [তাবারী, তাফসীর জামি‘উল বায়ান: ১/৫৪]

এভাবে আমরা দেখছি যে, ‘ইলাহাহ্’ শব্দটি আরবীতে ‘ইবাদাহ্’ শব্দের সমার্থক। [ইবনু মানযূর, লিসানুল আরব: ১৩/৪৬৮-৪৬৯]

এই ‘ইবাদাত’ বা ‘ইবাদাহ’ (العبادة) শব্দের অর্থ আমরা বাংলায় সাধারণভাবে উপাসনা বা পূজা বলতে পারি। তবে ইসলামের পরিভাষায় ‘ইবাদাত’ অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবহ এবং এর বিবিধ স্তর রয়েছে। পরবর্তী অনুচ্ছেদে আমরা এ বিষয়ে কিছু আলোচনা করব। আমরা আমাদের আলোচনায় সাধারণভাবে উপাসনা, পূজা, ইত্যাদি শব্দের পরিবর্তে ‘ইবাদাত’ ব্যবহার করব, যেন আমরা ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাটির সকল অর্থ ও ব্যবহার ভালভাবে বুঝতে পারি।

إلا  শব্দের অর্থ— ব্যতীত, ছাড়া বা ভিন্ন।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, لا إله إلا الله বাক্যটির অর্থ: ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই’। অর্থাৎ যদিও আল্লাহ ছাড়া অন্য অনেক কিছুকেই ইবাদত, উপাসনা, পূজা বা আরাধনা করা হয়, তবে সত্যিকারভাবে ইবাদত করার যোগ্য বা মা‘বুদ হওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই নেই। আল্লাহই সকল প্রকার ইবাদাতের একমাত্র যোগ্য। ইসলামের পরিভাষায় ইবাদাত বলতে যা বুঝানো হয় তার সবকিছুই একমাত্র তাঁরই জন্য।

বিভিন্ন হাদীসে এই বাক্যের সাথে যোগ করা হয়েছে: وحده لا شريك له। আমরা দেখেছি যে, আরবীতে وَحَدَ ক্রিয়াপদটির অর্থ: এক হওয়া বা অতুলনীয় হওয়া।

لا শব্দটি ‘মোটেও নেই’ বা ‘কিছুই নেই’ অর্থ প্রকাশ করছে।

شريك অর্থ অংশীদার বা সহযোগী। শব্দটি আরবী থেকে বাংলায় প্রবেশ করেছে এবং ‘অংশীদার’ অর্থে ‘শরিক’ এখন বাংলা ভাষায় অতি পরিচিত শব্দ। আরবীতে শির্‌ক্ (شِرْك) অর্থ অংশীদার হওয়া (to share, participate, be partner, associate)। ইশরাক (إشراك) ও তাশরিক (تَشْرِيك) অর্থ অংশীদার করা বা বানানো। সাধারণভাবে ‘শির্‌ক্‌’ শব্দটিকেও আরবীতে ‘অংশীদার করা’ বা ‘সহযোগী বানানো’ অর্থে ব্যবহার করা হয়। [আল-ফাইয়ূমী, আল-মিসবাহুল মুনীর: পৃ. ৩১০]

له অর্থ ‘তাঁর’ বা ‘তাঁর জন্য’।

তাওহীদের ঘোষণা বা সাক্ষ্যের এই অংশের অর্থ: মহান আল্লাহ একক ও অতুলনীয়, তাঁর কোনো অংশীদার বা সহযোগী নেই।

তাওহীদের প্রকারভেদ: এক

আকীদাহর উৎসের বিচ্যুতির কারণে, অর্থাৎ কুরআন-হাদীসের গভীর অধ্যয়ন পরিত্যাগ করে— আভিধানিক অর্থ, নিজের বুদ্ধি-বিবেক, দর্শন ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে তাওহীদের ব্যাখ্যা করতে যেয়ে অনেক পণ্ডিত মনে করেছেন যে, ‘তাওহীদ’ অর্থ মহান আল্লাহকে একমাত্র অনাদি সত্তা বা একমাত্র স্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান হিসেবে বিশ্বাস করা। তাদের এ চিন্তা কুরআন ও হাদীসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়।

কুরআনের অগণিত বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, আরবের ও অন্যান্য জাতির কাফিরগণ আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্বের একত্বে বিশ্বাস করত এবং তাঁকেই একমাত্র স্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান প্রতিপালন হিসেবে বিশ্বাস করত। এতটুকুতেই যদি তাওহীদ পরিপূর্ণ হয়, তবে তো আর তাদেরকে কাফির বলার বা তাদের হেদায়াতের জন্য নবী-রাসূলগণের আগমনের প্রয়োজন থাকত না।

কুরআন ও হাদীসের অগণিত বিবরণের আলোকে আমরা বুঝতে পারি যে, তাওহীদ বা আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসের একাধিক পর্যায় বা স্তর রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلا وَهُمْ مُشْرِكُونَ

‘তাদের অধিকাংশ আল্লাহতে বিশ্বাস করে, কিন্তু তাঁর সাথে শরিক করে।’ [সূরা ইউসূফ: ১০৬]

এ আয়াত থেকে স্পষ্টতই জানা যায় যে, আল্লাহর প্রতি ঈমানের পর্যায় রয়েছে, যে কারণে ঈমানের সাথে শির্‌ক্ যুক্ত হয়ে যেতে পারে। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবী ইবনু আব্বাস (রা) বলেন,

‘তাদের ঈমান হলো, যদি তাদের বলা হয়— আকাশ কে সৃষ্টি করেছে? পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছে? পাহাড় কে সৃষ্টি করেছে? তারা বলে: আল্লাহ, অথচ তারা শির্‌ক্ করে.. তারা আল্লাহর সাথে শির্‌ক্ করে, আল্লাহকে ছাড়া অন্যের ইবাদত করে, আল্লাহ ব্যতিরেকে অন্যদের সাজদা করে।’ [তাবারী, তাফসীর জামি‘উল বয়ান: ১৩/৭৭-৭৮]

প্রসিদ্ধ তাবি‘ঈ মুফাসসির মুজাহিদ ইবনু জাবর (মৃ. ১০৪ হি.) বলেন:

إيمانهم قولهم الله خالقنا ويرزقنا ويميتنا فهذا إيمان مع شرك عبادتهم غيره

‘তাদের ঈমান হলো— তারা বলে, একমাত্র আল্লাহই আমাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনিই আমাদের রিযক দেন এবং তিনিই আমাদের মৃত্যু দেন। এ হলো তাদের ঈমান, এর সাথে তারা তাদের ইবাদতে গাইরুল্লাহর ইবাদত করে শির্‌ক্ করে।’ [তাবারী, তাফসীর জামি‘উল বয়ান: ১৩/৭৭-৭৮]

অনুরূপভাবে সাঈদ ইবনু জুবাইর (মৃ. হি. ৯৫), আমির ইবনু শারাহীল শা‘বী (হি. ১০৪), ইকরিমাহ মাওলা ইবনু আব্বাস (হি. ১০৫), আতা ইবনু আবী রাবাহ (হি. ১১৫), কাতাদাহ ইবনু দি‘আমাহ (হি. ১১৭), আবদুর রাহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম (হি. ১৭০) ও অন্যান্য তাবি-তাবি‘ঈ ও মুফাসসিরগণ বারংবার উল্লেখ করেছেন যে, সকল কাফিরই আল্লাহকে একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, রিযিকদাতা ও সর্বশক্তিমান বলে বিশ্বাস করতো, কিন্তু তারা ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরিক করতো। [তাবারী, তাফসীর জামি‘উল বয়ান: ১৩/৭৭-৭৯]

এভাবে আমরা দেখছি যে, তাওহীদের অন্তত দুটি পর্যায় রয়েছে এবং কাফিরগণ একটি বিশ্বাস করতো আর একটি অস্বীকার করত। কুরআন কারীমের এ জাতীয় অগণিত নির্দেশনা এবং সাহাবী, তাবি‘ঈ ও তাবি-তাবি‘ঈগণের এ সকল তাফসীরের আলোকে পরবর্তী যুগের আলিমগণ ‘তাওহীদ’-কে দু’ভাগে ভাগ করেছেন। কেউ কেউ দুটি পর্যায়কে আরো বিস্তারিতভাবে তিনটি বা চারটি পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন।

হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ইমাম আল্লামা সাদরুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনু আলাউদ্দীন আলী ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবিল ইয্‌য দিমাশকী (হি. ৭৩১-৭৯২) তাঁর রচিত ‘শরাহুল আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ গ্রন্থে তাওহীদকে প্রথমত দু’পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন— ১. তাওহীদুল ইসবাত ওয়াল মা‘রিফাত (توحيد الإثبات والمعرفة) অর্থাৎ জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদ  ২. তাওহীদুত তালাবি ওয়াল কাসদি (توحيد الطلب والقصد) বা কর্ম পর্যায়ের তাওহীদ। [ইবনু আবিল ইয্‌য, শারহুল আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ: পৃ. ৮৯]

অন্যত্র তিনি উক্ত প্রথম পর্যায়ের তাওহীদকে দুটি পর্যায়ে বিভক্ত করে তাওহীদকে তিন পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন—

(১) তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত, (২) তাওহীদুর রুবূবিয়্যাত ও (৩) তাওহীদুল ইলাহিয়্যাহ। [ইবনু আবিল ইয্‌য, শারহুল আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ, পৃ. ৭৮]

প্রসিদ্ধ আলিম ও সংস্কারক শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) (১১৭৬ হি.) প্রথম পর্যায়ের তাওহীদকে তিন পর্যায়ে বিভক্ত করেন এবং এভাবে তিনি তাওহীদকে চার পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন:

(১) আল্লাহকে একমাত্র অনাদি অনন্ত সত্তা বলে বিশ্বাস করা

(২) আল্লাহকে মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বাস করা

(৩) আল্লাহকে মহাবিশ্বের একমাত্র পরিচালক হিসেবে বিশ্বাস করা।

(৪) আল্লাহকে একমাত্র মা‘বুদ বা উপাস্য হিসেবে বিশ্বাস করা। [শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা ১/১৭৬]

এভাবে আমরা দেখছি যে, তাওহীদের মূলত দুটি পর্যায় রয়েছে এবং প্রথম পর্যায়টির একাধিক পর্যায় রয়েছে। এখানে আমরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে তাওহীদের প্রকারভেদ ব্যাখ্যা করব।

জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদ

আমরা দেখেছি যে, এ পর্যায়ের তাওহীদকে তাওহীদুল ইসবাত ওয়া মা‘রিফাহ বা জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদ বলা হয়। কখনো বা (التوحيد العلمي الخبري)  অর্থাৎ ‘জ্ঞান ও সংবাদের একত্ব’ বলা হয়। [মোল্লা আলী কারী, শারহুল ফিকহিল আকবার, পৃ ১৫]

জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদের দুইটি মূল বিষয় রয়েছে: ১. সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একত্ব, ও ২. নাম ও গুণাবলীর একত্ব।

সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একত্ব

আরবীতে একে ‘তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ’ (توحيد الربوبية) বা ‘প্রতিপালনের একত্ব’ বলা হয়। [মোল্লা আলী কারী, শারহুল ফিকহিল আকবার, পৃ. ১৫]

এর অর্থ বিশ্বের সকল কিছুর সৃষ্টি, প্রতিপালন, সংহার ইত্যাদির বিষয়ে আল্লাহর একত্ব। তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ বা সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একত্বে বিশ্বাস করার অর্থ এ কথা বিশ্বাস করা যে, মহান আল্লাহই এ মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, পরিচালক, সংহারক, রিযিকদাতা, পালনকর্তা, নিয়ন্ত্রক ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

কুরআন কারীমে বিভিন্ন আয়াতে ‘তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ’ বা সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একত্বের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:  الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

‘প্রশংসা আল্লাহর নিমিত্ত যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক।’ সূরা (১) ফাতিহা: ১ আয়াত।

তিনি আরো বলেছেন:

أَلا لَهُ الْخَلْقُ وَالأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

‘জেনে রাখ! সৃষ্টি ও নির্দেশনা (পরিচালনা) একমাত্র তাঁরই, জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ মহিমাময়।’ [সূরা আ‘রাফ: ৫৪]

তিনি আরো বলেছেন: إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহই মহাশক্তিময় রিয্‌কদাতা।’ [সূরা যারিয়াত: ৫৮]

অন্যত্র তিনি বলেছেন: وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا

‘তিনি সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে পরিমিত করেছেন যথাযথ অনুপাতে।’ [সূরা ফুরকান: ২]

এভাবে কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একত্বের কথা বলা হয়েছে।

অধিকাংশ কাফির এ পর্যায়ের তাওহীদে বিশ্বাস করত

কুরআন ও হাদীসের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, এ পর্যায়ের তাওহীদের বিষয়ে কাফির-মুশরিকদের মধ্যে তেমন কোনো আপত্তি বা মতভেদ ছিল না। সাধারণভাবে কাফিরগণ বিশ্বাস করত যে, আল্লাহই এ বিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, রিয্‌কদাতা, জীবনদাতা, একক সার্বভৌমত্ব ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে তারা আল্লাহর ইবাদত করত। তারা আল্লাহর ইবাদাত করার সাথে সাথে ফেরেশতাগণ, কোনো কোনো নবী-রাসূল, সত্য বা কল্পিত আল্লাহর প্রিয় বান্দা, তাঁদের মূর্তি, স্মৃতিবিজড়িত স্থান, দ্রব্য বা পাথরের ‘ভক্তি’ করত। ‘ভক্তি’-র প্রকাশ হিসেবে তারা এ সকল দ্রব্য বা স্থানে ‘সাজদা’ করত, মানত করত বা প্রার্থনা করত, যে সকল কর্ম ইসলামের পরিভাষায় ‘ইবাদত’ বলে গণ্য। তারা কখনোই দাবি করত না যে, এ সকল ‘উপাস্য’ এ বিশ্বের কোনো কিছু সৃষ্টি করেছে বা প্রতিপালন করে, বরং তারা আল্লাহকেই একমাত্র স্রষ্টা, রব, প্রতিপালক, সর্বশক্তিমান ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বলে বিশ্বাস করত।

কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ أَمْ مَنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ فَقُلْ أَفَلا تَتَّقُونَ

‘বল, আসমান এবং জমিন থেকে কে তোমাদেরকে রিয্‌ক দান করেন? কে দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির মালিক? কে মৃত থেকে জীবিতকে নির্গত করেন এবং জীবিত থেকে মৃতকে নির্গত করেন? বিশ্ব পরিচালনা করেন কে? তারা উত্তরে বলবে: আল্লাহ। বল: তাহলে কেন তোমরা আল্লাহকে ভয় করছ না।’ [সূরা ইউনূস: ৩১]

অতঃপর আল্লাহ বলছেন:

قُلْ هَلْ مِنْ شُرَكَائِكُمْ مَنْ يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ قُلِ اللَّهُ يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ فَأَنَّى تُؤْفَكُونَ

‘বল, তোমরা যাদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক বানিয়েছ তাদের কেউ কি সৃষ্টি করতে পারে এবং ধ্বংসের পরে পুনরায় সৃষ্টি করতে পারে? একমাত্র আল্লাহই সৃষ্টি করেন এবং পুনরায় সৃষ্টি করেন। তোমরা কোথায় যাচ্ছ?’ [সূরা ইউনূস: ৩৪]

অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন:

قُلْ لِمَنِ الأَرْضُ وَمَنْ فِيهَا إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ. سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلا تَذَكَّرُونَ. قُلْ مَنْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ. سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلا تَتَّقُونَ. قُلْ مَنْ بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلا يُجَارُ عَلَيْهِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ. سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ.

‘(কাফিরদেরকে) বল, তোমাদের যদি জ্ঞান থাকে তবে বল, এই পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা রয়েছে তারা কার? তারা বলবে: আল্লাহর। বল, তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না? বল, সপ্ত আকাশের রব-প্রতিপালন ও মহান আরশের রব-প্রতিপালক কে? তারা বলবে: আল্লাহ। বল, তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না? বল, তোমরা যদি জান তবে বল, সকল কিছুর সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব কার হাতে? যিনি ত্রাণের ক্ষমতা রাখেন, যার উপর ত্রাণ দাতা বা রক্ষাকর্তা নেই? তারা বলবে: আল্লাহ। বল, তবুও তোমরা কেমন করে বিভ্রান্ত হচ্ছ?’ [সূরা মুমিনূন: ৮৪-৮৯]

এভাবে আমরা দেখছি যে, কাফিররা মহান আল্লাহকে মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, সকল ক্ষমতা, রাজত্ব ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী ও সর্বশক্তিমান বলে বিশ্বাস করত। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ আরো বলেছেন,

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ. اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ. وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ نَزَّلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَحْيَا بِهِ الأَرْضَ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهَا لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لا يَعْقِلُونَ.

‘তুমি যদি তাদেরকে প্রশ্ন কর, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রিত করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। তাহলে তারা কোথায় চলেছে? আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রিয্ক বর্ধিত করেন আর যার জন্য ইচ্ছা তা সীমিত করেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী। আপনি যদি তাদেরকে প্রশ্ন করেন, ভূমি মৃত হওয়ার পর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে কে তাকে সঞ্জীবিত করেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। আপনি বলুন, প্রশংসা আল্লাহরই নিমিত্ত, কিন্তু তাদের অধিকাংশই অনুধাবন করে না।’ [সূরা আনকাবুত: ৬১-৬৩]

অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لا يَعْلَمُونَ

‘যদি তাদেরকে প্রশ্ন কর, আকাশমণ্ডলী এবং ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে: ‘আল্লাহ।’ আপনি বলুন, প্রশংসা আল্লাহর নিমিত্ত, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।’ [সূরা লুকমান: ২৫]

মহান আল্লাহ আরো বলেন:

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ لَيَقُولُنَّ خَلَقَهُنَّ الْعَزِيزُ الْعَلِيمُ

‘যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে এগুলি তো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ।’ [সূরা যুখরূফ: ৯]

অন্যত্র ইরশাদ করা হয়েছে:

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ

‘যদি জিজ্ঞাসা কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?’ [সূরা যুখরূফ: ৮৭]

অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন:

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلْ أَفَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ

‘যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ বল, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ আমার অনিষ্ট চাইলে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি সে অনুগ্রহ রোধ করতে পারবে? বল, ‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ নির্ভরকারীগণ আল্লাহর উপরেই নির্ভর করে।’ [সূরা যুমার: ৩৮]

এ সকল আয়াত থেকে আমরা জানছি যে, কাফিররা এক বাক্যে স্বীকার করত যে, মহান আল্লাহই বিশ্বের সকল কিছুর একমাত্র স্রষ্টা, পরিচালক, প্রতিপালক, বৃষ্টিদাতা, ফসলদাতা, রিয্‌কদাতা, সকল ক্ষমতার মালিক, সর্বশক্তিমান, তাঁর উপরে কেউ আশ্রয়দাতা নেই, মানুষের সকল শক্তি তাঁর নিয়ন্ত্রণে, তিনি অনিষ্ট চাইলে কেউ তা দূর করতে পারে না এবং তিনি কল্যাণ চাইলে কেউ তা রোধ করতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিরোধিতা করা সত্ত্বেও এ কথা তার অকপটে স্বীকার করতো।

তারা এভাবে মহান আল্লাহর রুবূবিয়্যাতের একত্বের সুস্পষ্ট ঘোষণা দিলেও অস্পষ্ট একটি ধারণা তাদের মধ্যে ছিল যে, আমাদের উপাস্যগণ আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছু করতে সক্ষম না হলেও, বা আল্লাহ চূড়ান্ত ফয়সালা দিলে তা পরিবর্তনের ক্ষমতা না রাখলেও সাধারণভাবে কিছু অলৌকিক নিষ্ট-অনিষ্টের ক্ষমতা তাদের আছে, যা আল্লাহই তাদের দিয়েছেন। [ক্রমশঃ]

ড. খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহিমাহুল্লাহ

Facebook Comments