ঈমান, ইলম, আমল ও ইবাদত

 

আমি দুনিয়াতে শান্তি ও আখিরাতে মুক্তি পেতে চাই কিনা— এ বিষয়টি আমার জীবনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আখিরাতের অনন্ত অসীম জীবনে যদি আল্লাহর রহমত না পাই তাহলে কোনো উপায় থাকবে না। বিষয়টা মোটেই হালকা নয়। যদি আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, আমি দুনিয়ার অশান্তি থেকে বাঁচতে চাই এবং আখিরাতের শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে চাই, তাহলে আমাকে এ কয়টি কাজ করতে হবে—

১. ঈমানকে মযবুত করতে হবে।

২. সহীহ ইলম হাসিল করতে হবে।

৩. নেক আমল করতে হবে।

কেউ যদি নিজেকে ঠিকভাবে গড়ে তুলতে চায় তাহলে তাকে তিন দিক দিয়ে গড়ে উঠতে হবে। তার মন, মগজ ও চরিত্র গড়তে হবে। মনের সাথে ঈমানের সম্পর্ক, মগজের সাথে ইলম বা জ্ঞানের সম্পর্ক আর চরিত্রের সাথে আমলের সম্পর্ক। বাংলায় মন-মগজ-চরিত্র বললে আরবীতে ঈমান-ইলম-আমল বোঝায়।

এ তিনটি দিক দিয়েই মানুষ গড়ে ওঠে। তাহলে সবার আগে ঈমান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

ঈমান

‘ঈমান’ আরবী শব্দ। এর বাংলা অর্থ ‘বিশ্বাস’। আমরা বিশ্বাস শব্দটি সবাই বলি। কিন্তু এর সঠিক অর্থ বুঝতে হবে। আমরা জ্ঞানের চারটি উৎসের আলোচনায় জেনেছি যে, পাঁচটি ইন্দ্রিয় দিয়েই আমরা সরাসরি জ্ঞান লাভ করি। পাঁচটি ইন্দ্রিয়-চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও চামড়া দিয়ে খুব সামান্য জ্ঞানই আমরা পেয়ে থাকি। যখন সরাসরি জ্ঞানে (Direct knowledge) কোনো বিষয় জানতে পারি না, অথচ ঐ বিষয়ে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতেই হচ্ছে তখন বাধ্য হয়ে পরোক্ষ জ্ঞানের (Indirect knowledge) সাহায্য নিতে হয়। পরোক্ষ জ্ঞানের সাহায্যে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তারই নাম ‘বিশ্বাস’।

একটি সহজ উদাহরণ দিচ্ছি— আমার পরিচিত এক লোক এসে বলল, ‘ভাই আমাকে ৫০০ টাকা কর্জ দাও, আমি এক সপ্তাহ পর ফেরত দেব।’ এক সপ্তাহ পর সে ফেরত দেবে কি না, সে বিষয়ে তো আমার সরাসরি জ্ঞান নেই। আমি টাকা ধার দেব কি দেব না, সে বিষয়ে কেমন করে সিদ্ধান্ত নেব? আমাকে তো একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে— হয় তাকে বিশ্বাস করে টাকা ধার দেব, আর বিশ্বাস না হলে দেব না। এ সিদ্ধান্ত আমি কেমন করে নেব? তার সম্বন্ধে আমি যতটুকু জানি তাতে যদি আমার ধারণা হয়, তাকে টাকা দিলে ফেরত পাওয়া যবে তাহলে ধার দেব। আর যদি মনে হয, এ লোক ফেরত দেবে না তাহলে ধার দেব না। সত্যি ফেরত দেবে কি না তা সরাসরি জানার উপায় নেই। পরোক্ষ জ্ঞানের ভিত্তিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

এ উদাহরণ থেকে বুঝতে হবে, ‘বিশ্বাস’ মানে কী? ‘বিশ্বাস’ বললে কী বোঝায়? ‘বিশ্বাস’-এর সংজ্ঞা কী? তা হলো চারটি কথা:

১. যে বিষয়ে সরাসরি জ্ঞান নেই।

২. অথচ সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

৩. তাই পরোক্ষ জ্ঞান ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপায় নেই।

৪. পরোক্ষ জ্ঞানের ভিত্তিতে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এরই নাম ‘বিশ্বাস’।

লোকটির উপর বিশ্বাস হলে ধার দেব, অবিশ্বাস হলে দেব না। এখানে মজার ব্যাপার হলো, অবিশ্বাসটাও এক রকমের বিশ্বাস। একটি ইতিবাচক, বিশ্বাস, অপরটি নেতিবাচক। অবিশ্বাস মানে এ বিশ্বাস যে, সে টাকা ফেরত দেবে না। টাকা দেওয়া ও না দেওয়া দুটোই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে।

এবার একটা বড় উদাহরণ দিচ্ছি। মৃত্যুর পর আবার জীবিত হতে হবে কিনা, এ বিষয়ে সরাসরি জানার উপায় নেই। অথচ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘আখিরাত থাকলে থাকুক না থাকলে না থাকুক আমার কী’ এভাবে উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিষয় এটা নয়। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে বহু পরোক্ষ জ্ঞান দান করেছেন; যার ফলে মানুষ আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়। আল্লাহর দেওয়া মযবুত যুক্তি বুঝলে বিশ্বাস না করে পারা যায় না।

এ দুটো উদাহরণ থেকে আমরা সহজভাবে বিশ্বাস বা ঈমানের অর্থ বুঝতে পারলাম।

বিশ্বাস ছাড়া কি চলা যায়?

পাঁচ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে এত সামান্য বিষয় জানা যায় যে, বিশ্বাস ছাড়া মানুষ একদিনও চলতে পারবে না। আমার মা কে, বাবা কোন্‌ জন- এ বিষয়ে আমার কি সরাসরি জ্ঞান আছে? বিশ্বাস ছাড়া উপায় কী? স্ত্রী যে খাবার খেতে দিল তাতে বিষ আছে কি না, তা তদন্ত করে কি খাই? বিশ্বাস না হলে খাওয়াই বন্ধ। অসুখ হলে ডাক্তার ওষুধ দেয়। এ ওষুধে কাজ হবে কি না, তা কি সরাসরি জানি? বিশ্বাস করেই ওষুধ খেতে হয়। চাষী জমিতে ফসসল বুনে। এবার ফসল হবে কি না, তা সে জানে না। গতবার হয়েছে, এর আগের বারও হয়েছে। তাই বিশ্বাস হয় যে, এবারও হবে। এ বিশ্বাস না হলে কি চাষী ফসল বুনতে পারবে? একটু চিন্তা করলেই সবাই বুঝতে পারবে যে, বিশ্বাস ছাড়া মানুষের জীবন অচল।

বিশ্বাস  কর্ম দুরকম হয় না

এ কথা খুবই সত্য যে, মানুষ যে রকম বিশ্বাস করে সে রকম কাজই করে। বিশ্বাস ও কর্মের সম্পর্ক অতি নিকটবর্তী। টাকা ধার দিলে ফেরত পাওয়া যাবে না বিশ্বাস হলে কর্ম সে রকমই নেতিবাচক হবে— যার এ বিশ্বাস সে অবশ্যই ধার দেবে না। তাই মানুষের কর্ম থেকেই তার বিশ্বাস কেমন তা বোঝা যায়। যে নিজেকে মুসলমান মনে করে, অথচ নামাযের ধার ধারে না— বোঝা যাবে যে, তার ঈমান অতি দুর্বল। যে আখিরাতে বিশ্বাস করে বলে দাবি করে, সে ইচ্ছা করে জেনে-শুনে মন্দ কাজ করতে পারে না। যদি মন্দ কাজ করে তাহলে মনে করতে হবে যে, তার বিশ্বাসে গোলমাল আছে। হয়ত সে মনে করে, মরার আগে তাওবা করলেই মাফ হয়ে যাবে। কর্ম ও বিশ্বাসে বেমিল থাকলে বুঝতে হবে যে, বিশ্বাস সঠিক হয়নি।

মুসলিম হতে হলে যা বিশ্বাস করা জরুরি

কেউ যদি ইসলাম কবুল করতে চায় বা মুসলিম হতে চায়, তাহলে তাকে ৭ টি বিষয়ে বিশ্বাস করতে হবে, যার পরোক্ষ জ্ঞান কুরআন ও হাদীসে আছে। তাকে ঘোষণা করতে হবে:

الْمَوْتِبَعْدَوَالْبَعْثِ تَعَالى اللهِ مِنَ هوَشَرِّ ه خَيْرِ وَالْقَدْرِ الْاخِرِ وَالْيَوْمِ وَرَسُوْلِه وَكُتُبِه وَمَلئِكَتِه بِاللهِ امَنْتُ

‘আমানতু বিল্লাহি ওয়ামালাইকাতিহী, ওয়াকুতুবিহী, ওয়ারুসূলিহী, ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি, ওয়াল ক্বাদরি খাইরিহী,  ওয়া শাররিহী, মিনাল্লাহি তা‘আলা ওয়াল বা‘অছি বা‘দাল মাউত।’

এর অর্থ হলো, আমি ৭টি বিষয়ের উপর ঈমান এনেছি—

১. আল্লাহ, ২. তাঁর ফেরেশতাগণ, ৩. তাঁর কিতাবসমূহ, ৪. তাঁর রাসূলগণ, ৫. আখিরাতের দিন, ৬. তাকদীর-এর ভালো ও মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়, ৭. মৃত্যুর পর আবার জীবিত হওয়া।

 সাতটি বিশ্বাসের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

. আল্লাহ: যিনি আসমান, জমিন এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে সবই পয়দা করেছেন। আল্লাহই তাঁর আসল নাম। তাঁর গুণবাচক নাম রয়েছে। অন্যান্য ধর্মও বিশ্বাস করে যে, সব কিছুর স্রষ্টা একজনই। খ্রিস্টানরা তাঁকে গড (God) নামে ডাকে। হিন্দুরা বলে ঈশ্বর বা ভগবান।

. ফেরেশতা: ফেরেশতারা আল্লাহর কর্মচারী; তাঁরা ভালো মন্দ সম্পর্কে জানেন। কিন্তু তাঁরা সব সময়ই আল্লাহর হুকুম পালন করেন। তাঁরা কখনও আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলেন না। আল্লাহর কোনো গুণের সাথেই তাঁরা কোনো দিক দিয়ে শরীক নন। তাঁরা শুধুই কর্মচারী।

. কিতাব: রাসূলগণের নিকট ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ কিতাব নাযিল করেছেন। শেষ রাসূলের নিকট কুরআন নাযিল করা হয়েছে। পূর্বের কিতাবগুলোর কোনোটাই আসল অবস্থায় নেই। আল্লাহ তাআলা কুরআনকে কিয়ামত পর্যন্ত আসল অবস্থায় হেফাযত করার দায়িত্ব নিয়েছেন।

আমাদেরকে হুকুম করা হয়েছে, যেন আমরা একমাত্র কুরআনকে মেনে চলি। কিন্তু আমাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ সকল নবী ও রাসূলের কাছেই ওহী পাঠিয়েছেন।

. রাসূলগণ: এ কথা বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। তবে একমাত্র শেষ নবীকেই মেনে চলতে হবে।

. আখিরাতের দিন: যেদিন সব মানুষকে হাশরের ময়দানে একত্র করা হবে, সে দিনকেই আখিরাতের দিন বলা হয়েছে। সেখানে সব মানুষের বিচার হবে এবং ফায়সালা হবে যে, কে বেহেশতে যাবে, আর কে দোযখে যাবে।

. তাকদীর: এ শব্দটির অর্থ হলো যা নির্ধারিত হয়ে আছে। এ কথা বিশ্বাস করতে হবে যে, দুনিয়ায় তা-ই ঘটে যা আল্লাহ ঠিক করে রেখেছেন। ভালো ও মন্দ যা-ই ঘটে আল্লাহর ফায়সালামতোই ঘটে থাকে। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না।

তাকদীর সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হওয়া ঈমানের জন্য খুবই জরুরি। দুটো কথা বুঝে নিলেই এ বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকবে না:

ক. আল্লাহ তাআলা মানুষকে কোনো কাজ সমাধা করার ক্ষমতা দেননি। মানুষ কোনো কাজের জন্য ইচ্ছা ও চেষ্টা করতে পারে মাত্র। কাজটি পুরা হওয়া আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। যদি তাকদীরে থাকে তাহলে সমাধা হবে। তাকদীরে না থাকলে কাজটা সম্পন্ন হবে না।

খ. কোনো কাজের শুধু ইচ্ছা ও চেষ্টা করার ক্ষমতাই মানুষকে দেওয়া হয়েছে। তাই যদি মানুষ কোনো ভালো কাজের ইচ্ছা ও চেষ্টা করে তাহলে কাজটা সমাধা না হলেও সে কাজটা পুরা করেছে বলে পুরস্কার পাবে। তেমনিভাবে যদি সে কোনো খারাপ কাজের ইচ্ছা করে এবং তা করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে, তাহলে কাজটা পুরা না হলেও সে শাস্তি পাবে। কাজটা সমাধা করার ক্ষমতা তো মানুষকে দেওয়াই হয়নি। যেটুকু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এ ভিত্তিতেই পুরস্কার বা শাস্তি পাবে।

যেমন— কেউ যদি হজ্জে যাওয়ার ইচ্ছা ও চেষ্টা করে এবং কাবার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায়, কিন্তু পথেই মারা যায় তাহলে সে হজ্জ করার পুরস্কার পাবে। কারণ, তার ক্ষমতা যতটুকু আছে ততটুকু সে করেছে।

তেমনিভাবে কেউ কাউকে মেরে ফেলার জন্য ইচ্ছা করে এবং শাবল হাতে নিয়ে মাথার উপরে তুলে মারার চেষ্টা করে, কিন্তু দু’জন লোক দৌঁড়ে এসে ধরে ফেলার কারণে মারতে না পারে তাহলে মেরে ফেলার ইচ্ছা ও চেষ্টা করার দোষে আদালতে সে শাস্তি পাবে।

এ দ্বারা প্রমাণ হয়, পুরস্কার ও শাস্তি পাওয়ার জন্য কাজটি সমাধা হওয়া জরুরি নয়। ইচ্ছা ও চেষ্টা করা হলেই পুরস্কার বা শাস্তি পাবে। তাকদীরের সাথে পুরস্কার ও শাস্তির কোন সম্পর্ক নেই। তাকদীর আল্লাহর হাতে।

. মৃত্যুর পর আবার জীবিত হওয়া: মানুষের শরীরটাই শুধু মরে। আসল মানুষ ‘রূহ’ মরে না। কিয়ামতের পর সব মানুষকে হাশরের ময়দানে একত্রিত করা হবে। দুনিয়ার কাজের হিসাব নেওয়া হবে এবং বিচারের পর বেহেশত কিংবা দোযখে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

এ সাতটি বিষয়ে সরাসরি কোনো জ্ঞান মানুষের নেই। তাই কুরআন ও হাদীসের পরোক্ষ জ্ঞানের সাহায্যেই এ সবের উপর ঈমান আনতে হয়।

তাওহীদরিসালাতআখিরাত

ঈমানের ওই ৭টি বিষয় তিনটি বিষয়ের মধ্যেই শামিল রয়েছে।

১. তাওহীদের মধ্যে আল্লাহ, ফেরেশতা ও তাকদীর শামিল রয়েছে।

২. রিসালাতের মধ্যে আছে কিতাবসমূহ ও রাসূলগণ।

৩. আখিরাতের মধ্যে মৃত্যুর পরের জীবন ও বিচারের দিন।

‘তাওহীদ’ মানে একক। এ শব্দটি ‘শিরক’ শব্দের বিপরীত। আল্লাহর সাথে কোনো দিক দিয়েই আর কোনো সত্তা শরীক নেই। আল্লাহ তার সত্তা, গুণাবলী, ক্ষমতা ও অধিকারে একক। এর কোনোটাতেই আর কোনো সৃষ্টি শরীক নয়। ফেরেশতাসহ সকল সৃষ্টি আল্লাহর অধীন। শির্‌ক মানে শরীক করা। আল্লাহর কোনো সৃষ্টিকে কোনো দিক দিয়ে আল্লাহর সাথে শরীক মনে করা সবচেয়ে বড় গুনাহ যা তিনি মাফ করবেন না বলে কুরআনে একাধিকবার ঘোষণা করেছেন।

ফেরেশতাদেরকে কাফিররা আল্লাহর কন্যা বলে বিশ্বাস করত। আর হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদেরকে দেব-দেবী বলে বিশ্বাস করে— এ সবই শির্‌ক। অন্ধকারের বিপরীত যেমন আলো, তেমনি শির্‌কের বিপরীত হলো তাওহীদ। অন্ধকার মানে আলো নেই। আলো মানে অন্ধকার নেই। শির্‌ক থাকলে তাওহীদ নেই। তাওহীদ থাকলে শির্‌ক নেই।

আল্লাহর সাথে সম্পর্ক

যখন কেউ আল্লাহর উপর ঈমান আনে তখন তার পরিচয় হয়ে যায় ‘মুমিন’। কুরআনে ‘ইয়া আইয়ুহাল-লাযীনা আমানূ’ কথাটি দিয়ে বহু আয়াত শুরু হয়েছে। এর অর্থ হলো, ‘হে ঐসব লোক, যারা ঈমান এনেছ!’ এসব আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঈমানদার হিসেবে ডাক দিয়ে কথা বলেন।

কুরআনের শেষ সূরাটির নাম ‘আন্‌ নাস’। এ সূরাটিকে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন যে, আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক তিন রকমের— রাব্বিন্‌ নাস, মালিকিন্‌ নাস ও ইলাহিন্‌ নাস।

১. তিনি মানুষের রব। ২. তিনি মানুষের বাদশাহ। ৩. তিনি মানুষের ইলাহ।

 

সত্যিকার ঈমানদার হতে হলে এ তিন রকমের সম্পর্কের মর্ম বুঝতে হবে। আমি যদি ঈমানদার বলে দাবি করি তাহলে এ কথা খেয়াল রাখতে হবে যে—

১. আল্লাহর সাথে আমার পয়লা সম্পর্ক হলো, তিনি আমার রব। রব শব্দের অর্থ হলো যিনি লালন-পালন করেন। তিনি আমাকে মায়ের পেটে ১০ মাস লালন-পালন করেছেন। পয়দা হওয়ার সাথে সাথে মায়ের বুকে আমার খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। প্রতি মুহূর্তে তিনি আমাকে লালন-পালন করেছেন। নিঃশ্বাস বন্ধ হলেই আমি মরে যাব। তিনি আমার নিঃশ্বাস জারি রেখেছেন বলেই আমি বেঁচে আছি। তিনি যতদিন আমার হৃদ্‌পিণ্ডকে চালু রাখেন ততদিনই বেঁচে থাকব। এমন রবকে কি ভোলা যায়? মায়ের স্নেহ-মমতা কি ভোলা যায়? যে রব আমার মায়ের মনে এমন মায়া দিলেন তাঁকে তো সব সময়ই মনে রাখা উচিত। তাই তিনি নামাযে রুকু ও সিজদায় ‘আমার রব’ ‘আমার রব’ জপ করার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ‘রাব্বুল আলামীন’, তথা সারা জাহানের রব। তবু আমাকে ‘আমার রব’ বলার অনুমতি দিয়ে আপন করে কাছে টেনে নিলেন। শিশু ‘আমার আম্মু’ ‘আমার আব্বু’ না বললে তৃপ্তি পায় না; যদিও আম্মু তার একার নয়, আরও ভাই-বোন তার আছে।

২. দ্বিতীয় সম্পর্ক হলো, তিনি আমার বাদশাহ। তাঁরই রাজ্যে আমি আছি। তিনি যদি আমার উপর খুশি থাকেন তবেই আমি সুখে থাকতে পারব। তাই সুখ পেতে হলে আমার এমন কিছু করা উচিত নয়, যা তিনি অপছন্দ করেন। এ বিষয়ে সব সময় আমাকে সাবধান থাকতে হবে।

৩. তৃতীয় সম্পর্ক হলো, তিনি আমার ইলাহ। আমাদের দেশে ইলাহ শব্দের যে অর্থ চালু আছে তা হলো ‘উপাস্য’। উপাস্য মানে উপাসনা বা পূজার পাত্র, যার উপাসনা বা পূজা করা হয়। যদি এ অর্থ মেনে নেওয়া হয় তাহলে বুঝতে হবে যে, শুধু উপাসনা করার সময় তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক, অন্য সময় কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ তিনি যেমন আমার সব সময়ই রব এবং বাদশাহ তেমনি সব সময়ই ইলাহ। তাই ইলাহ শব্দের ‘উপাস্য’ অর্থ করা একেবারেই ভুল।

ইলাহ শব্দের সমমর্যাদায় আরবীতে আরেক শব্দ হলো মা’বুদ। মা’বুদ মানে মনিব। আবদ মানে দাস, মা’বুদ মানে যার দাসত্ব করা হয়। দাস হলো হুকুমের গোলাম, আর মা’বুদ হলো দাসের হুকুমকর্তা। এ অর্থে ইলাহ মানে হুকুমদাতা বা হুকুমকর্তা। হুকুমকর্তা অনেক আছে, যেমন-পিতা-পাতা, অফিসের বস, সরকার ইত্যাদি। কিন্তু তারা হুকুমকর্তা হলেও প্রভু বা মনিব নয়। আল্লাহ তাআলা হুকুমকর্তা প্রভূ। তাই আল্লাহর হুকুমের বিরোধী কোনো হুকুম যদি কোনো হুকুমকর্তা দেয় তাহলে সে হুকুমকর্তাকে মানা যাবে না। কেননা, আল্লাহ তাআলাই একমাত্র হুকুমকর্তা প্রভু। তাহলে ইলাহ শব্দের অর্থ দাঁড়াল ‘একমাত্র হুকুমকর্তা প্রভু’।

আল্লাহ আমার ইলাহ— এ কথার মর্ম অনেক গভীর। তিনি সব সময় আমার একমাত্র হুকুমকর্তা প্রভু। অন্য কোনো হুকুমকর্তা আমার প্রভুর হুকুমের বিরোধী কোনো হুকুম করলে তা আমি কিছুতেই মানব না।

গোটা বিশ্বের স্রষ্টা ও প্রভুর সাথে আমার মতো নগণ্য দাসের এ তিন রকম সম্পর্কের সুযোগ দিয়ে আল্লাহ তাআলা আমাকে যে বিরাট গৌরব ও মর্যাদা দান করেছেন, তা এক মুহূর্তও কি ভুলে থাকা উচিত?

তিনি আমার প্রতিপালক, আমি প্রতিপালিত। তিনি আমার বাদশাহ, আমি তাঁর প্রজা, তিনি আমার একমাত্র হুকুমকর্তা প্রভু আর আমি তার হুকুমের গোলাম। এ চেতনাই ঈমানের প্রাণ। এ চেতনা সজাগ থাকলে ঈমান মযবুত থাকবে।

আল্লাহর প্রশংসা সূচক একটি গানের দুটো লাইন এখানে উল্লেখ করছি—

‘আল্লাহ আমার রব, এই রবই আমার সব।

দমে দমে তনুমনে তাঁরই অনুভব।’

নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে ও দেহমনে এ কথা অনুভব করাই হলো চেতনা।

ঈমান কীভাবে দুর্বল হয়?

নাফ্‌স ও রূহের মধ্যে যে লড়াই চলে সে আলোচনা থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, রূহ দুর্বল থাকলে নাফ্‌স জয়ী হয়। নাফ্‌সের জয়ই হলো ঈমানের দুর্বলতা। ঈমান দুর্বল হলেই নাফ্‌সের জয় হয় আর রূহের পরাজয়  হয়।

সূরা আলে ইমরানের ১৪ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের জন্য তাদের পছন্দসই জিনিসের মধ্যে— নারী, সন্তান-সন্ততি, সোনা-রূপার স্তূপ, বাছাইকৃত ঘোড়া, পালিত পশু ও চাষের জমি খুবই কামনার বিষয় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

এসবই দেহ বা নফ্‌সের জন্য লোভনীয়। একদিকে নাফ্‌স মানবদেহকে এদের দিকে টেনে নেয়, অপরদিকে রূহ আল্লাহর দিকে টানে। রূহের এ টান আছে বলেই কতক মানুষ দুনিয়ার সব মজা ছেড়ে দিয়ে বৈরাগী বা সন্ন্যাসী হয়ে জঙ্গলে চলে যায়। দুনিয়া ত্যাগ করা কি সহজ? তাঁরা মনে করেন যে, দুনিয়ার লোভনীয় জিনিসের মধ্যে থাকরে রূহের ডাকে সাড়া দেওয়া সম্ভব নয়। তাই তারা দুনিয়া থেকে পালিয়ে নাফ্‌সের তাড়না থেকে বাঁচতে চায়। জঙ্গলে গাছের নিচে পাথরের উপর বসে আল্লাহ বা ঈশ্বরের যিক্‌র ও ধ্যানে ডুবে থাকে।

কিন্তু এ পথ আল্লাহ মোটেই পছন্দ করেন না। তিনি যাদেরকে নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন তাঁরা মানুষকে বৈরাগী হওয়ার শিক্ষা দেননি। কুরআনে বারবার বলা হয়েছে, আসমান-জমিনের সকল সৃষ্টিই আল্লাহর তাসবীহ জপে। সন্ন্যাসী যে গাছের নিচে পাথরের উপর বসে তাসবীহ জপছে, ওই গাছ এবং পাথরও যিক্‌র করছে; কিন্তু গাছ ও পাথরের মতো নীরবে যিক্‌র করার জন্য তো মানুষকে পয়দা করা হয়নি। মানুষকে তো খিলাফতের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তাই আসল দায়িত্ব বাদ দিয়ে যারা গাছ ও পাথরের মতো হওয়ার চেষ্টা করে, তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে। আল্লাহ বলবেন, তোকে তো গাছ ও পাথর বানাইনি; মানুষ বানিয়েছি। গাছ-পাথর হতে গেলি কেন?

সংসারত্যাগীদেরকে ফারসি ভাষায় ‘দরবেশ’ বলা হয়। আসলে আল্লাহর কাছে তাদের দর খুবই কম, বেশি নয়। দুনিয়ার টান থাকা সত্ত্বেও যারা দুনিয়ার গোলাম না হয়ে আল্লাহর গোলাম হতে পারে তাদের কৃতিত্বের জন্যই তারা বেহেশতে যাবে। ফেরেশতাদের গুনাহ করার ক্ষমতাই নেই। তাই সবসময় আল্লাহর হুকুম পালন করা সত্ত্বেও তাঁদেরকে পুরস্কার দেওয়া হবে না। কারণ, এতে তাদের কোনো কৃতিত্ব নেই।

আল্লাহ তা‘আলা সূরা তাওবার ২৪ নং আয়াতে আটটি জিনিসের তালিকা দিয়েছেন। যথা— পিতা, পুত্র, ভাই, স্ত্রী, আত্মীয়, কামাই করা সম্পত্তি, আয়-রোজগারের মাধ্যম ও বাড়ি। এ ৮টি জিনিসকে ভালোবাসার দায়িত্ব মানুষকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ ৮টির ভালোবাসা যদি অন্য তিনটির চেয়ে বেশি হয় তাহলেই ঈমান দুর্বল বলে প্রমাণিত হবে। ওই ৩টি হলো আল্লাহ, রাসূল ও আল্লাহর পথে জিহাদ। ঐ ৮টি জিনিসের প্রতি ভালোবাসা থাকা দূষণীয় নয়, বরং কর্তব্য। এ সবের ভালোবাসা ত্যাগ করে বৈরাগী হয়ে গেলেও অপরাধ হবে। আবার এ কয়টির প্রতি ভালোবাসার পরিমাণ পরের তিনটির চেয়ে বেশি হলেই অপরাধ।

একটা সুন্দর উদাহরণ দিচ্ছি: পানি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। তাই বলা হয, পানির অপর নাম জীবন। প্রশ্ন হলো, পানিই যদি জীবন হয় তাহলে পানিতে ডুবে মানুষ মরে কেন? এতে বোঝা গেল, পানি জীবন নয়। পানির একটা নির্দিষ্ট পরিমাণই হলো জীবন। ঐ পরিমাণের বেশি হলেই মরণ। পানিই জীবন, আবার পানিই মরণ। এ জীবন-মরণ পানির পরিমাণের উপর নির্ভর করে।

তেমনিভাবে ঐ ৮টি জিনিসের ভালোবাসা যদি পরিমাণমতো হয় তাহলে ঈমানের জীবন; আর পরিমাণের বেশি হলেই ঈমানের মরণ।

আল্লাহ তা‘আলা ঐ আয়াতে সহজ কথায় বুঝিয়ে দিলেন যে, আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের তরীকা মতো চললে এবং দুনিয়ায় শয়তানের রাজত্ব উৎখাত করে আল্লাহর খিলাফত কায়েমের চেষ্টা করতে গেলেই প্রমাণ হবে যে, ঈমান দুর্বল না সবল। ঐ আটটির কারণে যদি এ তিনটির প্রতি দায়িত্বে অবহেলা করা হয় তাহলে বোঝা যাবে যে, ঈমান দুর্বল।

ইলম

আরবী ‘ইলম’ শব্দের বাংলা হলো বিদ্যা বা জ্ঞান। কুরআন ও হাদীসে ইলম শব্দ দ্বারা ওহীর ইলম বোঝানো হয়েছে। রাসূল সা. বলেছেন, ইলম তালাশ করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। এখানে ইলম অর্থ যদি সব বিদ্যাই হয় তাহলে কেউ এ ফরয আদায় করতে পারবে না। ডাক্তারী বিদ্যা, ইঞ্জিনিয়রিং বিদ্যা, কৃষিবিদ্যা ইত্যাদি শেখা সবার উপর ফরয হতে পারে না। তাই এ হাদীসে যে ইলম হাসিলের চেষ্টা করাকে ফর্‌য বলা হয়েছে তা অবশ্যই ওহীর ইলম।

কতটুকু ইলম ফরয?

ওহীর ইলম তো বিশাল। ৩০ পারা কুরআন ও লাখ লাখ হাদীস মিলে ওহীর ইলম। সবটুকু ইলম ফরয হতে পারে না। নবী ছাড়া অন্য কারো ওহীর সবটুকু ইলম জানা নেই। এ বিষয়টি সঠিকভাবে বোঝা সবার জন্য বড়ই জরুরি। কতটুকু ইলম ফরয? এ প্রশ্নের সহজ জবাব হলো, যার উপর যে দায়িত্ব আসে তা পালন করার জন্য যতটুকু ইলম জরুরি ততটুকু হাসিল করাই ফরয।

কালেমা তাইয়েবাতে আমরা দু’দফা ওয়াদা করেছি যে, জীবনে সব সময় আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের তরীকা মেনে চলব। তাই আমাদের যে দায়িত্বই পালন করতে হয়, মুসলিম হিসেবে তা পালন করতে হলে ঐ ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম কী ও রাসূলের তরীকা কী— তা জেনে নেওয়া ফরয। তা না হলে কাফিরের মতোই দায়িত্ব পালন করা হবে।

যার উপর যাকাত দেওয়া ফরয নয় তার ওপর যাকাতের ইলম হাসিলও ফরয নয়। যাকাত দেওয়ার দায়িত্ব আসলে সে ইলম ফরয হয়ে যাবে। যে বিয়ে করেনি, মুসলিম স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে কিভাবে চলতে হবে সে ইলম তার উপর ফরয নয়। বিয়ে করার সাথে সাথে দু’জনের উপর তা ফরয হয়ে যাবে।

যে ব্যবসা করে তাকে এ বিষয়ে ওহীর ইলম জানতে হবে। তা না হলে কাফির ব্যবসায়ীর মতোই ব্যবসা করবে— যদিও সে পাক্কা নামাযী ও রোযাদার হয়। যে দেশ শাসনের দায়িত্ব পালন করছে, সে যদি মুসলিম শাসকের মর্যাদা পেতে চায় তাহলে রাসূল (সা.) কিভাবে শাসন করেছেন তা তাকে জানতে হবে। তা না হলে সে কাফির শাসকের মতোই দেশ শাসন করবে। যখন কারো সন্তান পয়দা হয় তখন মুসলিম পিতা ও মাতার দায়িত্ব পালন করতে হলে এ বিষয়ে ওহীর ইলম হাসিল করতেই হবে।

ওহীর নফল ইলম হাসিলের মূল্য কী?

যে কাজ ফরয সে কাজ যদি ফরযের পরে আরো বাড়িয়ে করা হয় তাহলে তাকে নফল বলা হয়। নফল শব্দের অর্থ অতিরিক্ত। ওহীর যে ইলম ফরয নয় ঐ ইলম যদি কেউ শেখে তাহলে শরী‘আতে এর মূল্য কী? ইসলামী সকল বিধি-বিধানকে এক শব্দে আরবীতে ‘শরীআত’ বলা হয়।

যার ওপর হজ্জ ফরয নয়, সে যদি হজ্জের ইলম জেনে নেয় তাহলে কি সে কোনো বেহুদা কাজ করল? আমার ওপর দেশ শাসনের দায়িত্ব নেই; আমি এ বিষয়ে যেটুকু ইলম হাসিল করলাম, এর কি কোনো মূল্য নেই?

একটি হাদীস থেকে এর মূল্য জানা যায়। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘রাতের কিছু সময় ইলম শেখা ও শেখানো সারা রাত অন্য নফল আমল করার চেয়ে ভালো।’

এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, ওহীর ইলম চর্চা করা অন্যসব নফল আমলের তুলনায় বেশি মূল্যবান। তাই আমাদের উচিত, সবসময় ইসলামী বই সঙ্গে রাখা। যখনই এমন হয় যে, হাতে কোনো কাজ নেই তখনই ইসলামের জ্ঞান অর্জন করে সময়টা এমন কাজে লাগাতে পারি, যা অনেক মূল্যবান।

শরী‘আতে অন্যান্য বিদ্যার মূল্য আছে কি?

মুসলমানের জীবনকে তো শরী‘আত মতোই চালাতে হবে। কেউ যদি ডাক্তারি বিদ্যা শেখে তাহলে শরী‘আতের হিসাবে এর কি কোনো মূল্য নেই? সে কি শরী‘আতের বাইরে চলে গেল?

একটি হাদীস থেকে এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘হালাল কামাই করার চেষ্টা করা সব ফরযের পর ফরয।’ এতে জানা গেল, নামায, রোযা ও অন্যান্য যত ফরয আছে সেসব যেমন ফরয, হালাল রোজগারের চেষ্টা করাও তেমনি ফরয।

রুজি-রোজগার করতে হলে কোনো একটা পেশা বাছাই করে নিতে হয়। যে পেশাই বাছাই করা হোক, এর জন্য যে বিদ্যা দরকার তা শিখতেই হয়। যে চিকিৎসার পেশা গ্রহণ করে তাকে ডাক্তারি বিদ্যা শিখতে হয়। যদি সে হালালভাবে কামাই করতে চায় তাহলে তাকে ওই বিদ্যা ভালো করে শিখতে হবে। ডাক্তারি বিদ্যা ঠিকমতো না শিখে যদি চিকিৎসা করে রোগীর কাছ থেকে টাকা নেয় তাহলে তার আয় হালাল হবে না। তাই তার আয় হালাল করার জন্যই এ বিদ্যা শিখতে হবে। শরী‘আতের হিসাবে ডাক্তারি বিদ্যা ফরয নয়; কিন্তু যে চিকিৎসাকে পেশা বানিয়েছে তার রোজগারকে হালাল করার জন্যই ঐ বিদ্যা শেখা তার উপর ফরয।

এ উদাহরণ থেকে প্রমাণ হলো, মানুষের হালাল কামাই করার জন্য যেসব বিদ্যা শিখতে হয় তা সরাসরি ফরয না হলেও পরোক্ষভাবে ফরয। এসব বিদ্যা শেখা বেহুদা কাজ নয়। মানুষের খিদমতের জন্য যত রকমের পেশা দরকার সেসবের বিদ্যা পরোক্ষভাবে তাদের ওপর ফরয, যারা ঐসব পেশা গ্রহণ করে। যেসব পেশা হারাম সেসবের বিদ্যা শেখাও হারাম। যেমন— গণকি পেশা।

আমল

‘আমল’ আরবী শব্দ। এর বাংলা হলো কাজ। মানুষ কোনো কাজের চিন্তা করলে ঐ কাজের সূচনা হয়। সে কাজের জন্য ইচ্ছা ও চেষ্টা করা হলে তাকে আমল বা কাজ বলা হয়।

তাকদীর সম্পর্কীয় আলোচনায় আমরা জেনেছি যে, কোনো কাজের ইচ্ছা ও চেষ্টা করা হলেই কাজটি সমাধা না হলেও তা কাজ করা হয়েছে বলে ধরা হবে। কারণ, কাজটি সমাধা করা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে, এটা মানুষের ইখতিয়ারে নেই। কাজটি সমাধা না হলেও কাজের ফল আখিরাতে দেওয়া হবে। কাজটি ভালো হলে পুরস্কার পাবে, মন্দ হলে শাস্তি পাবে।

মানুষ শুধু ইচ্ছা ও চেষ্টার জন্য দায়ী। কোনো কাজ কারো হাতে যদি ইচ্ছা ও চেষ্টা ছাড়াই সমাধা হয়ে যায়, তাহলে এর জন্য তাকে দায়ী করা হয় না। যেমন— এক লোক পাখি শিকারের জন্য গাছে গুলি চালাল। গাছে যে একজন মানুষ ছিল তা সে জানত না। গুলি লেগে লোকটি মারা গেল। মেরে ফেলার কাজটি সমাধা হয়ে গেল। কিন্তু এ কাজের ইচ্ছা তো সে করেনি এবং এ উদ্দেশ্যে সে চেষ্টাও করেনি। আদালতে এ কথা প্রমাণিত হলে লোকটির কোনো শাস্তি হবে না। অথচ মেরে ফেলার কাজটি কিন্তু হয়েই গেল।

আল্লাহ তা‘আলার বড়ই মেহেরবানী যে, যদি কেউ কোনো ভালো কাজ করার নিয়ত বা ইচ্ছা করে, কিন্তু এর জন্য চেষ্টা করার সময় বা সুযোগ না পায়, তবুও তিনি তাকে কিছু পুরস্কার দেবেন। আর যদি সে মন্দ কাজের নিয়ত করে, তাহলে চেষ্টা না করা পর্যন্ত তাকে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না, বরং চেষ্টা না করার কারণে তাকে কিছু পুরস্কার দেওয়া হবে বলে রাসূল (সা.) বলেছেন।

মানুষের আমলের হিসাব মৃত্যুর সাথে সাথেই শেষ হয় না

আদালতে আখিরাতে যখন মানুষের আমলনামা (দুনিয়ায় যা করেছে তার হিসাব) দেওয়া হবে, তখন যারা নেক আমল করেছে তাদের ডান হাতে এবং যারা বদ আমল করেছে তাদের বাম হাতে দেওয়া হবে। যারা আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের তরীকা মতো চলেছে তারা নেক আমল করেছে বলে গণ্য হবে। আর যারা এর বিপরীত চলেছে তারা বদ আমল করেছে বলে ধরে নেওয়া হবে।

আমলনামা হাতে পেয়ে নেক লোক ও বদ লোক সবাই দেখবে যে, দুনিয়ায় তারা যে পরিমাণ কাজ করেছে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি কাজের হিসাব সেখানে লেখা আছে। তখন সবাই আল্লাহকে ডেকে বলবে, আমরা তো এত কিছু করিনি, আমাদের হিসাবে এত আমল কেমন করে লেখা হলো? জবাবে আল্লাহ বলবেন, দুনিয়ায় বেঁচে থাকাকালে তোমরা যা কিছু করেছ তা তো লেখা আছেই; মৃত্যুর পরও তোমাদের আমল বন্ধ হয়নি। তোমরা অন্যদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছ, তোমাদেরকে করতে দেখে যারা করতে শিখেছে, তোমরা যাদেরকে করতে উৎসাহ দিয়েছ, তারা যা আমল করেছে তাও তোমাদের আমলনামায় যোগ হয়েছে। তোমাদের মৃত্যুর পরও তোমাদের আমলের হিসাব জারি ছিল। এ কথা নেক ও বদ উভয় রকমের আমলের বেলায়ই সত্য।

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কাজের পথ দেখায় সে তার মতোই, যে কাজ করে।’ যে কাজ করে তার আমলনামায় যেমন সওয়াব বা গুনাহ লেখা হবে, যে ওই কাজের পথ দেখায় তার আমলনামায়ও তা যোগ হবে। আমার চেষ্টায় যদি কোনো বেনামাযী নামাযী হয়ে যায়, তাহলে সারা জীবনে সে যত নামায আদায় করেছে, এর নেকী ওই লোকের আমলনামায় যা হবে, আমার আমলনামায়ও তা-ই লেখা হবে। তাই মৃত্যুর পরও আমল জারি থাকে।

সহীহ্ নিয়ত ছাড়া নেক আমলও কবুল হয় না

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই নিয়ত অনুযায়ীই আমলকে বিবেচনা করা হয়।’ কোনো আমল দেখতে যত ভালো বলেই মনে হোক, কী নিয়তে কাজটি করা হয়েছে এর হিসাব নিয়েই আল্লাহ ওই কাজটিকে কবুল করবেন।

হাদীসে আছে, হাশরের দিন এমন এক লোককে ডাকা হবে, যে জিহাদের ময়দানে শহীদ হয়েছে। তাকে আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, দুনিয়ায় আমার জন্য তুমি কী করেছ? সে বলবে, আমি তোমার দীনের জন্য জিহাদ করে আমার জান কুরবান করে দিয়েছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। তুমি এ নিয়তে জিহাদ করেছ যে, লোকেরা তোমাকে বীর বলবে, বাহাদুর বলবে। তোমার ঐ নিয়ত আমি দুনিয়ায়ই পূরণ করে দিয়েছি। লোকেরা তোমাকে বীর বলেছে। আমার কাছ থেকে কিছু পাওয়ার নিয়ত তোমার ছিল না। তাই তোমাকে দোযখে দেওয়া হলো।

এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে? লোকটি জিহাদের ময়দানে জান দিয়ে দেওয়ার পরও তাকে দোযখে যেতে হলো। এর একমাত্র কারণ, তার নিয়ত সহীহ্‌ ছিল না। প্রমাণ হলো, খাঁটি নিয়ত ছাড়া জিহাদের ময়দানে শহীদ হলেও কোনো পুরস্কার পাওয়া যাবে না। তাই আমলের ব্যাপারে নিয়তের বিষয়টি সবচেয়ে জরুরি। নিয়ত সহীহ্‌ না হলে বড় নেক আমলেরও কোনো দাম নেই। তাহলে সহীহ্‌ নিয়ত সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা দরকার।

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘ঐ লোকই বুদ্ধিমান, যে তার নাফ্‌সকে দমন করে এবং যে কোনো কাজ করলে এর ফল আখিরাতে কী পাবে সে হিসাব করেই করে।’ দুনিয়ায় নগদ কী ফল পাবে সে হিসাব করে কাজ করা একেবারেই বোকামি। যদি কেউ আখিরাতের হিসাব করে কাজ করে তাহলে— মিথ্যা কথা বলা, ওজনে কম দেওযা, ঘুষ নেওয়া ইত্যাদি কোনোটাই করতে সে সাহস করবে না।

নিয়তকে খাঁটি করতে হলে খেয়াল রাখতে হবে— আমি যে নেক আমলই করি, তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি (খুশি) ও আখিরাতের সাফল্য লাভের উদ্দেশ্যে করছি কি-না। নিয়ত সহীহ্‌ হলেই আল্লাহ আমাদের আমল কবুল করবেন ও পুরস্কার দেবেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত করার সাথে সাথে আখিরাতের সফলতার কথাও খেয়ালে রাখতে হবে। আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকলেই আখিরাতে সফল হওয়া যাবে বটে; কিন্তু যেহেতু আখিরাতের সাফল্যই আসল উদ্দেশ্য, সেহেতু নিয়তের বেলায় ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের সাফল্য’— এ দুটো কথা একসাথেই খেয়াল করা জরুরি।

রাসূল (সা.) বলেছেন, শুধু আমলের কারণেই নাজাত পাওয়া যাবে না। একমাত্র আল্লাহর রহমত হলেই মুক্তির আশা করা যায়। এতে বোঝা গেল— যত নেক আমলই করি না কেন, আল্লাহর দরবারে তা কবুল হওয়ার যোগ্য না হলে এবং তিনি দয়া না করলে উপায় নেই। তাই তাঁর দয়ার আশাই আসল ভরসা।

দীন ইসলামের কতক জরুরি বিষয়ে সঠিক ধারণা

দীন ইসলামের এমন কতক বিষয় রয়েছে, যা সঠিকভাবে না জানলে পদে পদে ভুল ধারণা থেকে যাবে। তাই ঐ কয়টি বিষয় এখানে আলোচনা করছি:

. মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে মুমিনের সম্পর্ক কেমন?

আমরা আগে জেনেছি যে, জীবনের সব দিকেই এবং সব সময়ই আল্লাহ আমাদের ‘একমাত্র হুকুমকর্তা প্রভু’। মুহাম্মাদ (সা.) তেমনি জীবনের সব ক্ষেত্রে ও সব সময় ‘একমাত্র আদর্শ নেতা।’। নেতা তাকেই বলা হয়, যার পেছনে চলতে হয়, যার কথা মানতে হয়, যাকে অনুসরণ করতে হয়।

আল্লাহ তাআলা সূরা আল আহযাবের ২১ নং আয়াতে বলেছেন, ‘তোমাদের জন্য রাসূলের মধ্যে সুন্দরতম আদর্শ রয়েছে।’ আদর্শ মানে যা অনুকরণযোগ্য। হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য সুন্দর করে অক্ষরগুলো লেখাসহ বই আছে। ঐ সবকে বলে ‘আদর্শলিপি’। লিপি মানে লেখা। এ বই দেখে নকল করতে থাকলে হাতের লেখা সুন্দর হয়।

তেমনি আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (সা.)-কে সুন্দর আদর্শ মানুষ বানিয়ে তাঁকে সব ব্যাপারে নকল করতে বলেছেন। তিনি যা বলেছেন ও যা করেছেন সবই সুন্দর বলে আল্লাহর ঐ আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষ হিসেবে দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে হলে যা যা করতে হয় তা সবই তিনি সবচেয়ে সুন্দরভাবে করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তাঁর জীবনকে আদর্শ হিসেবে অনুকরণ করলে নেক মানুষ, সৎ মানুষ ও আদর্শ মানুষ হওয়া যাবে।

তিনি সবদিক দিয়েই সবার আদর্শ। তিনি আদর্শ স্বামী, আদর্শ পিতা, আদর্শ শাসক, আদর্শ সেনাপতি, আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ বিচারক, আদর্শ প্রতিবেশী, আদর্শ বন্ধু ইত্যাদি।

মুহাম্মাদ (সা.) আমাদের মতোই একজন মানুষ। তাই তিনি যেভাবে জীবনযাপন করেছেন আমাদেরও সেভাবে চলা সম্ভব। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি দুনিয়া ও আখিরাতে আমাদের সবচেয়ে বেশি জরুরি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষকে যা কিছু করতে হয় তা সুন্দরভাবে করতে হলে তাঁর জীবন ও শিক্ষা থেকেই তা জানতে হবে। মৃত্যুর পরও এ মানুষটি ছাড়া আমার উপায় নেই। কবরে তাঁকে দেখানো হবে এবং তাঁকে চিনি কি না সে কথা জিজ্ঞেস করা হবে। দুনিয়াতে যারা তাঁকে মেনে চলে তারা তাঁকে দেখে চিনতে পারবে। চিনতে পারলেই কবরের বিপদ কেটে যাবে। হাশরের ময়দানে কঠিন পিপাসায় যে পানি পান করলে আর পিপাসার কষ্ট হবে না, সে পানির কর্তা হবেন তিনি। হাউজে কাউসার নামের বিশাল পুকুরের পানি সে-ই পাবে, যাকে তিনি দেবেন। আল্লাহর নিকট সুপারিশ (শাফা‘আত) করার জন্যও তাঁকে দরকার হবে। তাহলে দেখা গেল, তাঁকে ছাড়া দুনিয়ায়ও ঠিকভাবে চলা সম্ভব নয়, আখিরাতেও তিনি ছাড়া উপায় নেই।

আমরা যাদেরকে আপনজন মনে করি, তাদেরকে আমরা ভালোবাসি। রাসূল সা. এর চেয়ে আপন আর কে হতে পারে? তাই তিনি বলেছেন, ‘পিতা-মাতা, সন্তানাদি এমনকি দুনিয়ার সব মানুষের চেয়ে আমাকে যে বেশি ভালো না বাসে সে মুমিন নয়।’ সত্যি তাঁর চেয়ে বেশি প্রিয় আর কোনো মানুষ হতে পারে না। তাঁকে যে পরিমাণ ভালোবাসা হবে সে পরিমাণই তাঁকে মেনে চলা সম্ভব হবে।

তাই আল্লাহর যিক্‌র যেমন বেশি বেশি করতে হয, তেমনি রাসূল (সা.)-এর উপর বেশি কেরে দরূদ পড়তে হবে।

সূরা আলে ইমরানের ৩১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! মানুষকে বলুন, যদি তোমরা সত্যি আল্লাহকে মহব্বত কর, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর; তবেই আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ আল্লাহর ভালোবাসা পেতে হলে অবশ্যই রাসূলকে মেনে চলতে হবে।

রাসূল শুধু ধর্মনেতা নন, জীবনের সবদিকেই তিনি একমাত্র আদর্শ নেতা। তিনি ছাড়া আর কেউ আসল আদর্শ নয়। আমরা সাহাবায়ে কেরামকে কেন মানি? রাসূল (সা.)-কে কীভাবে মানতে হবে তা তাঁদের কাছ থেকেই আমরা শিখি। তাঁদেরকে মানার জন্য নয়, রাসূলকে মানার জন্যই তাঁদেরকে মানি। তাই আসল আদর্শ শুধু রাসূল (সা.)। অবশ্য রাসূলকে মানার ক্ষেত্রে তাঁর সাহাবায়ে কেরাম আমাদের আদর্শ। সাহাবা মানে সাথী। তাঁরা যেভাবে রাসূল (সা.)-কে মেনেছেন, আমাদেরকেও সেভাবে মানতে হবে।

. কুরআন কেমন কিতাব?

মুসলিম জনগণ কুরআনকে ধর্মগ্রন্থ হিসেবে ভক্তি-শ্রদ্ধা করে এবং সওয়াবের আশায় তিলাওযাত করে। কুরআনে কী বলা হয়েছে তারা তা জানা ও বোঝার দরকার মনে করে না। অথচ আল্লাহ কুরআনকে মানবজাতির হিদায়াতের জন্য পাঠিয়েছেন বলে ঘোষণা করেছেন। হিদায়াত মানে পথ দেখানো। কুরআনে কোন্‌ পথ দেখানো হয়েছে তা না জানলে কেমন করে তা মেনে চলা যাবে?

দুনিয়ার জীবনে যেভাবে চললে সুখ-শান্তি পাওয়া যাবে এবং আখিরাতেও সফল হওয়া যাবে, সে হিদায়াতই কুরআনে আছে। তাই কুরআনকে বুঝতে হবে। না বুঝে শুধু তিলাওয়াত করার জন্য কুরআন নাযিল হয়নি। যারা লেখাপড়া জানে না তাদের কথা আলাদা। তারা কোনো রকমে তিলাওয়াত করলেও প্রতিটি অক্ষরের জন্য ১০টি করে নেকী পাবে বলে হাদীসে আছে। কিন্তু যারা দুনিয়ার সামান্য জীবনের সুখের জন্য ১৫/২০ বছর বিদেশী ভাষা শেখে, কুরআন বোঝার চেষ্টা করা কি তাদের কর্তব্য নয়? অল্প লেখা-পড়া জানলেও কুরআন বোঝার সুযোগ আছে। বাংলা ভাষায় কুরআনের বেশ কয়েকটি তাফসীর আছে।

যার উপর কুরআন নাযিল হয়েছে তার জীবন থেকেই কুরআন বোঝা সহজ। রাসূলের জীবনধারার সাথে মিলিয়ে লেখা তাফসীর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহায়ক। রাসূলের জীবনই আসল কুরআন, জীবন্ত কুরআন। কুরআনের আয়াতগুলোর শুধু অনুবাদ পড়ে সর্বাংশে কুরআন বোঝা যায় না। এজন্য তাফসীর পড়তে হবে। কুরআনের ব্যাখ্যাকেই তাফসীর বলা হয়।

. সবচেয়ে উঁচুমানের মুসলমান কারা?

আল্লাহ ও রাসূলের সার্টিফিকেট অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরামই সবচেয়ে উঁচুমানের মুসলমান। তাঁরা সরাসরি রাসূল (সা.) থেকে ট্রেনিং পেয়েছেন। তাই তাঁদের জীবনী থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখার আছে। তাঁদের মধ্যে প্রথম চার খলীফা— হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উমর (রা.), হযরত উসমান রা. ও হযরত আলী (রা.) অন্যদের চেয়ে সেরা। তাই এ চার জনের জীবনী বেশি করে জানা দরকার। [সাহাবাগণের জীবনী বাংলা ভাষায় প্রচুর রয়েছে, তাঁদের চর্চা বেশি হওয়া প্রয়োজন।]

সাহাবীগণের চেয়ে বেশি মর্যাদা আর কারো নয়। পরবর্তীদের মধ্যে যারা ঈমান, ইলম ও আমলের দিক দিয়ে তাঁদের যত কাছাকাছি তারা ততই শ্রদ্ধার পাত্র।

উন্নত মুসলিম হিসেবে মর্যাদার দিক দিয়ে সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে যারা দীন শিখেছেন তাদেরকেই গণ্য করতে হবে। ইসলামী পরিভাষায় এঁদেরকে ‘তাবেঈ’ বলা হয়। যাঁরা তাবেঈগণের কাছ থেকে দীন শিখেছেন, তাঁদেরকে তাবে-তাবেঈ বলা হয়। তাবেঈগণের পরেই তাবে-তাবেঈগণের মর্যাদা।

. দীনদারী  দুনিয়াদারীতে পার্থক্য কী

সাধারণত মনে করা হয় যে, নামায-রোযা, তাসবীহ-তিলাওযাত, যিক্‌র-আয্‌কার, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি হলো দীনদারী কাজ। আর আয়-রোজগার করা, বিয়ে-শাহদী করা, খাওয়া-পরা ইত্যাদি দুনিয়াদারী কাজ।

এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ রাসূল (সা.) যা কিছু করেছেন সবই দীনদারী। তিনি সবকিছু নবী হিসেবেই করেছেন। তিনি দেশ শাসন করেছেন, বিয়ে-শাদী করেছেন, যুদ্ধ করেছেন— এ সবই দীনদারী।

দীনদারী ও দুনিয়াদারীতে পার্থক্যটা বুঝতে হবে। আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের তরীকা মতো যা করা হয় সবই দীনদারী। আর যদি লোকদেখানোর জন্য নামায পড়া হয়, সুনামের উদ্দেশ্যে যাকাত দেওয়া হয় এবং নিজের নামে হাজী লেখার জন্য হজ্জ করা হয় তাহলে এগুলোও দুনিয়াদারী। দুনিয়ার সব কাজই দীনদারীও হতে পারে; দুনিয়াদারীও হতে পারে।

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ইশার নামায জামাআতের সাথে আদায় করে ঘুমিয়ে পড়ল, আবার ফজরের নামাযের জামা‘আতে শরীক হলো, তার ঘুমের সময়টা ইবাদত বলে গণ্য হবে।’ বোঝা গেল, রাসূলের তরীকা মতো ঘুমালে ঘুমটাও দীনদারীতে পরিণত হয়।

. ইবাদত কাকে বলে?

ইবাদত শব্দটি আরবী। আব্‌দ শব্দ থেকে ইবাদত শব্দটি গঠন করা হয়েছে। আব্‌দ মানে দাস। এ শব্দের সাথে আল্লাহর গুণবাচক শব্দ যোগ করে নাম রাখা হয়— আবদুর রহীম, আবদুর রাহমান, আবদুল কারীম ইত্যাদি। এসব নামের অর্থ হলো আল্লাহর দাস।

ইবাদত শব্দের অর্থ দাসত্ব বা দাসের কাজ। আল্লাহ গোলাম হিসেবে তাঁর হুকুম ও রাসূলের তরীকা মতো যা করা হয় সেসবই আল্লাহর দাসত্ব। শুধু নামায-রোযাই ইবাদত নয়। আল্লাহর হুকুম মতো করলে সব কাজই ইবাদত।

অবশ্য একটু পার্থক্য আছে। নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত হলো বুনিয়াদী ইবাদত। এসব ইবাদতের দ্বারা আল্লাহর দাসত্ব করার অভ্যাস করানো হয়; যাতে দুনিয়ার অন্য সব কাজ আল্লাহর পছন্দমতো করার যোগ্যতা সৃষ্টি হয়। ওই চারটি ইবাদত অন্য সব কাজকে ইবাদত বানিয়ে দেয়। যেমন উপরে লেখা হাদীসে জানা গেল, নামায ঘুমকেও ইবাদত বানিয়ে দিতে পারে।

মুমিনের জীবনের দীনদারী ও দুনিয়াদারী আলাদা আলাদা নয়। গোটা জীবনই দীনদারী ও ইবাদত। মানুষের জীবন আল্লাহর দাসত্বের অধীন না হলে শয়তানের দাসত্বের অধীন হতে বাধ্য।

. কুরআন  হাদীস

আল্লাহ তা‘আলা মানুষের জীবনের সকল দিকের জন্যই ওহীর মাধ্যমে রাসূল (সা.)-এর কাছে বিধি-বিধান ও নিয়ম-কানুন পাঠিয়েছেন। রাসূল (সা.) ওইসব বিধান শুধু মুখে শুনিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি নিজে সব বিধান পালন করে দেখিয়ে দিয়েছেন। যেকোন বিধান বুঝতে অসুবিধা মনে হলে, সাহাবায়ে কেরাম তা রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামের জীবনে যেসব নিয়ম-প্রথা চালু ছিল সেসবের কোনোটি শরী‘আত অনুযায়ী আপত্তিকর হলে রাসূল (সা.) দূর করতে বলে দিয়েছেন।

আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের যেসব আয়াত নাযিল করেছেন, এর ভাষা আল্লাহ নিজে রচনা করেছেন এবং জিবরীল (আ.) রাসূল (সা.)-কে তিলাওয়াত করে শুনিয়েছেন। এ ওহীকে ‘ওহীয়ে মাতলূ’ বলা হয়। মাতলূ মানে যা তিলাওয়াত করা হয়। রাসূল (সা.) জিবরীল (আ.) থেকে শুনে তা তিলাওয়াত করে (মুখে উচ্চারণ করে) সাহাবায়ে কেরামকে শুনিয়েছেন।

এ কুরআন একসাথে সবটুকু নাযিল হয়নি। রাসূল (সা.)-এর বয়স যখন ৪০ বছর তখন একদিন হেরা পর্বতের গুহায় জিবরীল (আ.) সূরা আলাক-এর প্রথম ৫টি আয়াত শুনিয়ে দেন। ৬৩ বছর বয়সে রাসূল (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় হন। এ ২৩ বছর ধরেই কিছু কিছু করে ১১৪টি সূরা নাযিল হয়।

কুরআনই শুধু ওহী নয়; হাদীসও ওহীর মধ্যে গণ্য। কুরআনের ভাষা ও ভাব সবটুকুই আল্লাহর রচনা আর হাদীসের ভাষা রাসূলের; ভাব আল্লাহর। কুরআনের অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া, মানুষের জীবনকে কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী গড়ে তোলার দায়িত্ব রাসূল (সা.)-কেই দেওয়া হয়েছেন।

এ দায়িত্ব তিনি তিন রকমে পালন করেছেন।

১. মুখে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন,

২. নিজে করে দেখিয়েছেন,

৩. সাহাবীগণের দিকে তিনি খেয়াল রাখতেন এবং তাঁদের জীবনে যা আপত্তিকর দেখতেন তা দূর করতে বলতেন।

এসব তিনি ওহীর জ্ঞানের ভিত্তিতেই করতেন। এসব ইলমকে একসাথে সুন্নাহ বলা হয়। রাসূল (সা.) নিজের ভাষায়ই বলতেন, কিন্তু যা বলতেন, এর ভাব আল্লাহর কাছ থেকে পেতেন। তিনি নিজের মন থেকে কোনো কথা বানিয়ে বলতেন না। ওহীর জ্ঞান থেকে যা জানতেন তা-ই বলতেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতেন। এ ওহী জিবরীল (আ.) তিলাওয়াত করে শুনিয়ে দেননি। ফলে একে ‘ওহী গায়রে মাতলূ’ বলা হয়। এ ওহীর ভাব আল্লাহ তা‘আলা রাসূল (সা.)-এর মনে ঢেলে দিতেন এবং রাসূল (সা.) নিজের ভাষায় তা জানিয়ে দিতেন।

হাদীসের তিনটি ধরন

. কাওলী হাদীস: হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী কতক হাদীসের শুরুতে বলেন, ‘রাসূল (সা.) বলেছেন’, বা ‘আমি রাসূল (সা.)-কে বলতে শুনেছি’। এসব হাদীসকে ‘কাওলী’ হাদীস বলা হয়। কাওল মানে কথা। রাসূল (সা.) কথায় যা জানিয়েছেন তা-ই কাওলী হাদীস।

. ফে‘লী হাদীস: হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী কতক হাদীসের শুরুতে বলেন, ‘আমি রাসূল (সা.)-কে এ রকম করতে দেখেছি’ বা ‘রাসূল (সা.) এ রকম করেছেন’। ফে‘ল মানে কাজ করা। রাসূল (সা.) কাজ করে যা জানিয়েছেন তা-ই ফে‘লী হাদীস।

. তাকরীরী হাদীস: যেসব কথা বা কাজ সাহাবায়ে কেরামকে বলতে ও করতে দেখে রাসূল (সা.) আপত্তি জানাননি বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, সেসব তাকরীরী হাদীস। ‘তাকরীরী’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘অনুমোদন’ অর্থাৎ এসব রাসূল (সা.) অনুমোদন করেছেন বা সমর্থন করেছেন, কোনো আপত্তি করেননি।

আবু নোমান

Facebook Comments