কুরআন বুঝে পড়তে হবে কেন?

ইসলামের মূল উৎস হচ্ছে আল-কুরআন, যা মহান আল্লাহ তা‘আলার নাযিলকৃত আমাদের জীবনবিধান। এ বিধান মেনে জীবন পরিচালনা করাটাই হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য বা ইবাদত করা। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মানতে হলে এবং অমান্য করার পরিণাম সম্পর্কে জানতে হলে নিশ্চয়ই কুরআন বুঝে পড়তে হবে। কেননা না বুঝে কুরআন পড়লে তা থেকে দিক-নির্দেশনা তথা হিদায়াত অর্জন সম্ভব নয়।

মানুষের ধর্মীয় জীবন কেমন হবে, সমাজ জীবনে মানুষ কিভাবে চলবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে কোন নীতির অনুসরণ করতে হবে, হালাল আয় কিভাবে করতে হবে, সঠিক পন্থায় কিভাবে ব্যয় করতে হবে, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশি, এতিম-মিসকিনের সাথে আচার ব্যবহার কেমন হতে হবে, গরীব-দুঃখীদের হক কী হবে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এবং একের উপর অন্যের দায়িত্ব ও অধিকার কী হবে ইত্যাদি দৈনন্দিন জীবনের সকল প্রকার প্রয়োজন মিটাবার নীতিমালা আল-কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা আছে।

আল্লাহ তা‘আলা সকলকে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য নির্ণয়ের জ্ঞান দিয়েছেন। যারা অন্যায় কাজ করে তারা তা জেনে বুঝেই করে থাকে। কারণ তাদের ঈমান দুর্বল এবং পরকালের পরিণাম সম্পর্কে তারা উদাসীন। সত্যিকারের খোদাভীতি বা তাকওয়া তাদের মন থেকে তিরোহিত। কুরআন মানুষের মন মানসিকতায় আল্লাহর বিধি-বিধান অমান্যকারীদের শাস্তির ভয় ও পরকালের জবাবদিহিতার প্রত্যয় সৃষ্টি করার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। মানুষের মনে যদি শেষ বিচারের পরিণাম সম্পর্কে সত্যিকার ভয় থাকে, তবেই সে সকল প্রকার অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে সচেষ্ট থাকবে।

বর্তমান সমাজে অনেক আলেম ও ইমাম সাহেব কুরআনের বিধি-বিধানের আলোচনা পরিহার করে এবং দু‘আ কবুলের শর্ত উল্লেখ না করে শ্রোতাবৃন্দকে কিছু যঈফ এবং মাওযু হাদীসের আমল দ্বারা কাজের কোনো প্রকার জবাবদিহিতা ছাড়াই অতি সহজে বেহেশতে যাওয়ার রাস্তা বাতলে দিয়ে পরোক্ষভাবে অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকতে উৎসাহিত করে যাচ্ছেন (সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৯ ও ১৭৪ দ্রষ্টব্য)।

এর অনিবার্য ফল হিসেবে আমাদের অধিকাংশ মানুষ ইহকালের কল্যাণ ও পরকালের মুক্তির লক্ষ্যে ভ্রান্ত আমলে লিপ্ত। পরিণতিতে তাদের সকল আমল ব্যর্থ হচ্ছে (সূরা কাহফ: ১০৩-১০৪)। এর প্রধান কারণ কুরআনের অজ্ঞতা ও ইসলামের নামে নানা ধরনের ভুল শিক্ষা। কুরআন ইসলাম ধর্মের মূল কিতাব বা পাঠ্যপুস্তক অর্থাৎ Text বই।

আল্লাহ বলেন, আজ তোমাদের জন্য তোমাদের জীবনব্যবস্থাকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম (সূরা আল মায়িদা: ৩)।

হাদীস এবং তাফসীর কুরআনের ব্যাখ্যা গ্রন্থ। রাসূলের পরবর্তীতে কোনো কোনো হাদীস ও তাফসীর নানা কারণে বিকৃত হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে Text বই বাদ দিয়ে কেবল ব্যাখ্যা গ্রন্থ অধ্যয়ন করলে ইবাদতে ভুল হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকবে। কেননা রাসূল (সা.)-এর পরবর্তীতে সমাজ স্বীকৃত কতিপয় স্বার্থপর আলেম ও ইসলামের শত্রু অল্প চেষ্টায় অধিক সাওয়াবের আশা দিয়ে এবং রাসূল (সা.)-এর প্রতি অতিরিক্ত ও কৃত্রিম ভালবাসা সৃষ্টির লক্ষ্যে রাসূলের নামে অতিরঞ্জিত কিচ্ছা-কাহিনীর মাধ্যমে নানা প্রকার র্শিক ও বিদ‘আতি আমল প্রচলন করে।

বর্তমান সমাজের অধিকাংশ আলেম ও ইমাম সাহেব মানুষকে খুশি করার জন্য এ সকল আমলের প্রচার ও প্রচলন অব্যাহত রেখেছেন। অথচ তারা একথা তুলে ধরছেন না যে, সঠিক ঈমান ও সঠিক ইবাদতের জন্য কুরআনের জ্ঞান অর্জন ব্যতীত কোনো বিকল্প নেই। কথায় বলে ‘ঈমান নাই যার, ধর্ম নাই তার’, অর্থাৎ ঈমানবিহীন আমলের কোনো মূল্য নেই।

শির্‌ক ও বিদ‘আতি আমল ইসলামের জন্য খুবই স্পর্শকাতর বিষয়, যা পূর্ববর্তী সকল ধর্মগ্রন্থ বিকৃতির মূল কারণ এবং ইবাদত কবুলের প্রধান অন্তরায়। অথচ আজ কুরআনের সঠিক জ্ঞানের অভাবে শির্‌ক ও বিদ‘আতের আমল আমাদের সমাজে শক্তভাবে শিকড় গেড়ে বসেছে। এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে হবে প্রতিটি মুসলিমকে।

কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে বান্দার কথোপকথন কীভাবে হতে পারে তার বাস্তব অনুভূতি পাওয়া যাবে একমাত্র কুরআনের সাথে পথচলায়। এক্ষেত্রে কুরআনের বাণীর অর্থ অনুধাবন করা ব্যতিত আর কোনো পন্থা নেই।

একজন খাঁটি মুসলমানের প্রতিদিনের অত্যাবশ্যকীয় (ফরয) ইবাদতের সাথে সাথে কিছু সুন্নাত ও নফল ইবাদতের সঠিক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যলাভের পথ সুগম হবে।

আমরা প্রতিদিন নামাযে এবং সকল প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে একাকী ও সমবেতভাবে দু‘আ করে থাকি। অবশ্য একটু লক্ষ্য করলে বুঝতে পারি, আমাদের দু‘আ কবুল হচ্ছে না। এর কারণ অনুসন্ধান করা কি আমাদের দায়িত্ব নয়?

 [মোঃ আমজাদ হোসেন চৌধুরীর লেখা থেকে]

Facebook Comments