জীবন জিজ্ঞাসার জবাব-১

প্রশ্ন-১: জনৈক মুফতী সাহেব বলেন, ফজরের আযানের পর এবং মাগরিবের আযানের কিছু পূর্বে মসজিদে প্রবেশ করার পর তাহইয়াতুল ওযু বা দুখুলুল মসজিদের সালাত আদায় করা যাবে না। তবে ফজরের সুন্নাতের সাথে বা মাগরিবের আযানের পর সুন্নাতের সাথে দুখুলুল মসজিদের নিয়তে সালাত আদায় করলে একই সঙ্গে উভয় সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। উক্ত কথার দলীল আছে কি?

— মুহাম্মাদ আশিকুর রহমান, ধানমন্ডি, ঢাকা।

উত্তর: ব্যাপক ভিত্তিক হাদীসের ভিত্তিতে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা-৭০৪) সঠিক ফয়সালা হচ্ছে— যে কোন সময়ে মসজিদে প্রবেশ করলে দু’রাক‘আত সালাত আদায় না করে বসবে না। এ কারণে উক্ত কথা সঠিক নয়। বরং সর্বাবস্থায় ফরয সালাতের পূর্বে সময় থাকলে ওযু করে মসজিদে প্রবেশের পর প্রথমে তাহইয়াতুল ওযু, অতঃপর তাহইয়াতুল মসজিদ আদায় করে সালাতের নির্ধারিত সুন্নাত আদায় করবে। আর সময় না থাকলে নির্ধারিত সুন্নাত আদায় করলেই তা তাহইয়াতুল মসজিদ-এর জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা: ৭/২৪৪)

প্রশ্ন-২: কিছু লোক বলে, যিনি মুরশিদ তিনি রাসূল। কখনো তিনি খোদা হন। এ কথা শুধু লালন নয় কুরআনও বলে। এর প্রমাণে তারা আলে ইমরান ৩১; নিসা ৮০, ১৫০; কাহ্‌ফ ১১০ আয়াত দলীল হিসাবে পেশ করে। উক্ত দাবী কি সঠিক? লালনের ভক্ত এই শ্রেণীর লোকদের অবস্থা পরকালে কী হবে?

— আবদুল্লাহ মাস‘ঊদ, বামুন্দী, গাংণী, মেহেরপুর।

উত্তর: এটি সম্পূর্ণরূপে শিরকী আকীদাহ। সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তাকে যারা এক করে দেখাতে চায়, তারা সর্বেশ্বরবাদী শিরকী দর্শনের অনুসারী। উক্ত বানোয়াট দর্শনের পক্ষে দলীল হিসাবে যা পেশ করা হয়েছে তা স্রেফ ধোঁকা ও প্রতারণা মাত্র। পৃথিবীর কোন সৃষ্টিই সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে তুলনীয় নয়।

আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর তুলনীয় কিছু নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।’ (শূরা: ১১) আর মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর বান্দা এবং আল্লাহ প্রেরিত সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ রাসূল। আল্লাহ বলেন, (হে মুহাম্মাদ) আপনি বলুন,‘আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ মাত্র; আমার প্রতি অহী করা হয় যে, তোমাদের মা‘বূদ মাত্র একজন।’(হা-মীম সাজদাহ ৬)

প্রশ্নে বর্ণিত আয়াতগুলিতে রাসূল (সা.)-এর প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের কথা বলা হয়েছে। রাসূলকে আল্লাহ বলা হয়নি। অথচ এইসব মুশরিকরা লালন ফকীরকে মুরশিদ ও রাসূল ভেবেছে। অতঃপর তাকেই আল্লাহ ভেবে নিয়েছে। এককথায় শয়তান এদের উপর সওয়ার হয়েছে। এগুলি শিরক। আর শিরকী আক্বীদার পরিণাম হলো জাহান্নাম।

আল্লাহ বলেন, إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ ‘যে আল্লাহর সাথে শিরক করে, আল্লাহ তার উপর জান্নাতকে হারাম করে দেন। তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।’ (মায়িদাহ ৭২) সুতরাং উক্ত ধোঁকা থেকে সাবধান থাকতে হবে।

প্রশ্ন-৩: আবু জাহলের বংশ পরিচয় সম্পর্কে জানিয়ে বাধিত করবেন। রাসূল (সা.)-এর সাথে তাঁর কোন রক্ত-সম্পর্ক ছিল কি?

— জাহাঙ্গীর আলম, বালানগর, বাগমারা।

উত্তর: কুরাইশ বংশীয় হিসাবে রাসূল (সা.)-এর সাথে আবু জাহ্‌লের দূরবর্তী সম্পর্ক রয়েছে, নিকটবর্তী কোন সম্পর্ক নেই। রাসূল (সা.) আবদু মানাফ গোত্রীয় আর আবু জাহ্ল বানু মাখযূম গোত্রীয়। রাসূল (সা.) এবং আবু জাহ্ল উভয়ের বংশ ‘মুর্‌রা ইবনু কো‘বে গিয়ে মিলিত হয়েছে। (সীরাতে ইবনে হিশাম: ১/১ ও ১/২৬৫ পৃ.)

প্রশ্ন-৪: খলীফা মামূনুর রশীদের আমলে মু‘তাযিলা সম্প্রদায় যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-কে কেন এই আকীদা পোষণ করার জন্য চাপ দিয়েছিল যে, ‘কুরআন আল্লাহর কালাম নয় বরং এটা আল্লাহর সৃষ্ট?’

— আবু সারা, কুয়েত।

উত্তর: কারণ হল, তৎকালীন সময়ে ইমাম আহমাদ (রহ.) সবচেয়ে বড় বিদ্বান ছিলেন এবং তার কথা সকল সত্যপন্থী জনগণ একবাক্যে মেনে নিত। তাই তিনি যদি বিষয়টির ব্যাপারে স্বীকৃতি দেন, তাহলে সবাই একবাক্যে তা মেনে নেবে।

উল্লেখ্য যে,‘কুরআন সৃষ্ট’ মতবাদটি কুফরী মতবাদ। কেননা এর দ্বারা কুরআনকে অন্যান্য সৃষ্টির মত ধারণা করা হয়। অথচ কুরআন সরাসরি আল্লাহর কালাম এবং এটাই আহলে সন্নাত ওয়াল জামা‘আত আহলে হাদীসের সহীহ আকীদাহ।

প্রশ্ন-৫: জনৈক ব্যক্তি পিতা-মাতার অবাধ্যতায় বিবাহ করেছে। এখন সে কিভাবে আল্লাহ তা‘আলা এবং পিতা-মাতার নিকট ক্ষমা পাবে?

— নজরুল ইসলাম, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।

উত্তর: এজন্য পিতা-মাতার নিকটে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। কেননা পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাত। (তিরমিযী; মিশকাত হা/৪৯২৭; নাসাঈ হা/৩১০৪)

প্রশ্ন-৬: জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের কি কি গুণাবলী থাকা আবশ্যক?

— বাশীরা, কামারকুড়ী, মান্দা, নওগাঁ

উত্তর: বিবাহের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে পাত্র ও পাত্রী উভয়ের ধার্মিকতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, তোমরা মুশরিক মেয়েদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। নিশ্চয়ই একজন ঈমানদার মেয়ে মুশরিক মেয়ের চেয়ে উত্তম। যদিও সে তোমাদেরকে মোহিত করে। তোমরা মুশরিক পুরুষদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। নিশ্চয়ই একজন ঈমানদার পুরুষ মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম। তারা জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে। আর আল্লাহ জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহ্বান করেন। (সূরা বাকারা: ২২১)

রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, সাধারণতঃ মেয়েদের চারটি গুণ দেখে বিবাহ করা হয়—  তার ধন-সম্পদ, বংশ-মর্যাদা, সৌন্দর্য এবং ধর্ম। তোমরা ধার্মিক মেয়েকে অগ্রাধিকার দাও। অন্যথায় তোমাদের উভয় হস্ত অবশ্যই ধূলায় ধূসরিত হবে। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/ ৩০৮২, ৩০৯০, ‘বিবাহ’ অধ্যায়)

রাসূল (সা.) বলেন, তোমরা বিবাহের জন্য উপযুক্ত পাত্রী নির্বাচন কর এবং সমতা দেখে বিবাহ কর (ইবনু মাজাহ হা/১৯৬৮; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১০৬৭)। পাত্রের ক্ষেত্রে তার দীনদারী এবং উত্তম আচরণের দিকে লক্ষ্য করতে হবে। রাসূল (সা.) আরো বলেন, مَنْ تَرْضَوْنَ دِيْنَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوْهُ ‘যার দ্বীনদারী এবং উত্তম আচরণে তোমরা সন্তুষ্ট, তার সাথে বিবাহ দাও।’ (তিরমিযী, মিশকাত হা/৩০৯০)

প্রশ্ন-৭: যাকাতের টাকা ইসলাম প্রচারের কাজে ব্যয় করা যাবে কি? যেমন ইসলামিক সিডি, বই, ক্যাসেট ইত্যাদি কিনে বিতরণ করার কাজে?

— তালহা খালেদ, দাম্মাম, সঊদী আরব

উত্তর: যাকাতের টাকা ইসলাম প্রচারের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এগুলো ফী সাবীলিল্লাহর অন্তর্ভুক্ত হবে (মাজমু‘ ফাতাওয়া উসায়মিন ১৮/২৫২)।

প্রশ্ন-৮: আমার এক আত্মীয় মারা যাওয়ার সময় এমন এক অছিয়ত করে গেছেন, যা পূরণ করতে তার রেখে যাওয়া সব সম্পদ লাগবে। এমতাবস্থায় করণীয় কী?

— মুহাম্মাদ আমীনুল ইসলাম, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম

উত্তর: অছিয়ত স্বরূপ সর্বোচ্চ এক তৃতীয়াংশ সম্পত্তি দান করা যায়। এর বেশি অছিয়ত করা বৈধ নয় (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৭১)। অতএব উক্ত অছিয়ত পূরণ করা আবশ্যক নয়।

প্রশ্ন-৯: পেটে বাচ্চা ওয়ালী গাভী অসুস্থ হলে যবেহ করে খাওয়া যাবে কি?

— মুছাবিবর, সৈয়দপুর, নীলফামারী

উত্তর: পেটে বাচ্চা ওয়ালী গাভী অসুস্থ হলে যবেহ করে খাওয়াতে কোন দোষ নেই। জাবির (রা.) বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, পেটের বাচ্চাকে যবেহ করা হচ্ছে তার মাকে যবেহ করা। (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৪০৯১)

এ হাদীসে গাভীর পেটের বাচ্চাকে হালাল বলা হয়েছে। মানুষের রুচি হলে পেটে বাচ্চাওয়ালী গাভী তো খেতে পারেই, এমনকি পেটের বাচ্চাও খেতে পারে।

প্রশ্ন-১০: একজন কুরআনের হাফেয কি একজন আলেমের চেয়ে অধিক মর্যাদাবান? উভয়ের উপস্থিতিতে কে ইমামতি করবেন?

—আবদুল্লাহ, মান্দা, নওগাঁ

উত্তর: আলেম ইমামতি করবেন, যদি তিনি শুদ্ধ করে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সবচেয়ে ভাল কারীকে ইমাম হওয়ার জন্য বলেছেন। উভয়ে যদি কিরাআতের দিক থেকে সমান হন, তাহলে যিনি সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক অবগত, তিনি ইমামতি করবেন। (মুসলিম, মিশকাত হা/১১১৭)

প্রশ্ন-১১: একটি সূরা বার বার পড়লে প্রত্যেকবার বিসমিল্লাহ পড়তে হবে কি? সূরার মধ্য থেকে পড়লে বিসমিল্লাহ বলতে হবে কি? পড়তে পড়তে কিছুক্ষণ বিরতির পর পড়লে বিসমিল্লাহ বলতে হবে কি?

— শফিকুল ইসলাম, গাবতলী, বগুড়া

উত্তর: সূরার প্রথম থেকে পড়া আরম্ভ করলে প্রতিবার বিসমিল্লাহ বলতে হবে। এমনকি কিছু বিরতির পর পড়লেও। কারণ একটি সূরা থেকে তার একটি সূরা পৃথক করার মাধ্যম হচ্ছে বিসমিল্লাহ। (আবুদাঊদ হা/৭৮৮) যে কোনো সময়ে যে কোনো স্থান হতে কুরআন পড়লে আঊযুবিল্লাহ পড়বে।

আল্লাহ বলেন, আপনি যখন কুরআন তেলাওয়াত করবেন তখন অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইবেন (সূরা নাহল ৯৮)। তবে বিষয়টি ‘মানদূব’ (ইচ্ছাধীন) পর্যায়ভুক্ত। (তাফসীর কুরতুবী, ইবনু কাছীর)

প্রশ্ন-১২: আমাদের দেশে সরকারীভাবে হিন্দুদের পূজায় টাকা দেওয়া হয়। নাগরিক হিসাবে এতে আমাদের পাপ হবে কি-না।

— আব্দুস সাত্তার, কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ

উত্তর: সরকার অমুসলিমদের জন্য নির্ধারিত খাত থেকে হিন্দুদের পূজার জন্য সহযোগিতা করতে পারে। তবে কোন মুসলিম ব্যক্তি কোন প্রকার সহযোগিতা করতে পারবে না। কারণ এটা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আর কোন প্রকার পাপের কাজে সহযোগিতা করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। (মায়েদাহ ২)

প্রশ্ন-১৩: স্বামীর কি কি অধিকার পালন করলে স্ত্রী জান্নাতে যেতে পারবে?

— আবুবকর, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম

উত্তর: ‘অধিকার’ বিষয়টি ব্যাপক। সেকারণ এ বিষয়ে ইসলামী শরী‘আতে মৌলিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন, যেকোন স্ত্রী (১) নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করে (২) রামাযানের ছিয়াম পালন করে (৩) লজ্জাস্থানের হেফাযত করে এবং (৪) স্বামীর আনুগত্য করে, সে  জান্নাতের যেকোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। (আবু নঈম, মিশকাত হা/৩২৫৪, সনদ হাসান)।

অন্যত্র তিনি বলেন, তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে ক্বিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে। …স্ত্রী তার স্বামীর গৃহের ও সন্তানদের দায়িত্বশীল’ (মুত্তাফাকুন আলাইহি, মিশকাত হা/৩৬৮৫)। তিনি বলেন, উত্তম স্ত্রী সেই, যার দিকে তাকিয়ে স্বামী আনন্দিত হয়। স্বামী কোন আদেশ করলে তা পালন করে এবং স্বামী যা অপছন্দ করেন, স্ত্রী তা করেনা।’ (নাসাঈ, মিশকাত হা/৩২৭২)

প্রশ্ন-১৪: বিবাহের সময় স্বামী তার স্ত্রীর মোহরানা আদায় করেনি। এখন আদায় করতে ইচ্ছুক। সম্পদ ও অর্থ কোনটি দ্বারা আদায় করবে?

— মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম, তালা, সাতক্ষীরা

উত্তর: সম্পদ বা অর্থ যা দিয়ে পরিশোধ করা হোক না কেন, তা ধার্যকৃত মোহরের সমপরিমাণ হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমাদের স্ত্রীদের কাছ থেকে যে স্বাদ গ্রহণ করেছ, তার বিনিময়ে তাদের জন্য নির্ধারিত মোহরানা আদায় কর।’ (নিসা ২৪)

প্রশ্ন-১৫: নামাযরত অবস্থায় কেউ সালাম দিলে উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি কি? নামাযরত অবস্থায় কেউ ডাকলে গলায় আওয়াজ করা যাবে কি?

— মুহাম্মাদ ইসমাঈল, মোহনপুর, রাজশাহী

উত্তর: সালাতরত অবস্থায় কেউ সালাম দিলে কথা না বলে শুধু হাত বা আঙ্গুলের ইশারায় সালামের উত্তর দিতে হবে। (তিরমিযী, নাসাঈ সহীহ সনদে, মিশকাত হা/৯৯১)

উল্লেখ্য যে, সালাতরত অবস্থায় গলার আওয়াজ দেওয়ার হাদীছটি যঈফ। (নাসাঈ, মিশকাত হা/৪৬৭৫; তামামুল মিন্নাহ পৃ. ৩১২)

প্রশ্ন-১৬: পিতা-মাতা আকীকা করে নাম রেখেছে। সন্তান বড় হয়ে বুঝতে পারলো যে, তার নাম অর্থহীন। এমতাবস্থায় তার নাম কি পরিবর্তন করা যাবে?

— আলাউদ্দীন, রাজারবাগ, ঢাকা

উত্তর: অর্থগত দৃষ্টিকোণ থেকে ত্রুটিপূর্ণ নামকে পরিবর্তন করে একটি সুন্দর ইসলামী নাম রাখাই শরী‘আতের বিধান। রাসূলুল্লাহ (সা.) মন্দ নাম পরিবর্তন করে দিতেন (তিরমিযী, মিশকাত হা/৪৭৭৪; ছহীহাহ হা/২০৭)। অতএব একজন ভালো আলেমের নিকট থেকে জেনে নিয়ে একটি উত্তম নাম রাখুন। প্রয়োজনে কোর্টে নাম পরিবর্তন করে এফিডেভিট করুন। (বিস্তারিত দেখুন: মাসায়েলে কুরবানী ও আকীকা পৃ. ৫১-৫৩)

প্রশ্ন-১৭: সিয়াম অবস্থায় গান শোনা, মিথ্যা কথা বলা, মেয়েদের দিকে কুদৃষ্টি দেওয়া প্রভৃতি পাপ কাজ করলে সিয়াম বাতিল হয়ে যাবে। উক্ত বক্তব্যটি কি সঠিক?

— মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ, উপশহর, রাজশাহী

উত্তর: কেবল সারাদিন পানাহার ও যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত থাকার নাম ছিয়াম নয়। বরং ছিয়াম সাধনা হচ্ছে পানাহার থেকে বিরত থাকার সাথে সাথে সকল প্রকার মিথ্যা থেকে বিরত থাকা। নবী করীম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে না, সে ব্যক্তির পানাহার থেকে বিরত থাকাতে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী হা/১৯০৩; মিশকাত হা/১৯৯৯) তাই এক্ষেত্রে ছিয়াম সরাসরি বাতিল না হলেও, নিঃসন্দেহে তা ক্রটিপূর্ণ হবে।

প্রশ্ন-১৮: স্বপ্ন সম্পর্কে ভালো-মন্দ বিশ্বাস করা যাবে কি?

— শরীফুল ইসলাম, সাঘাটা, গাইবান্ধা

উত্তর: স্বপ্ন ভাল ও মন্দ দুটিই হতে পারে। রাসূল (সা.) বলেন. ‘উত্তম স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। সুতরাং তোমাদের কেউ যদি ভাল স্বপ্ন দেখে তাহলে সে যেন ওই ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করে, যাকে সে ভালবাসে। আর যদি কেউ খারাপ স্বপ্ন দেখে তাহলে সে যেন তার ক্ষতি ও শয়তানের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর নিকট পরিত্রাণ চায় এবং বাম দিকে তিনবার থুথু মারে। আর কারো কাছে যেন প্রকাশ না করে। এতে তার কোন ক্ষতি হবে না।’ (মুত্তাফাকুন আলাইহি, মিশকাত হা/৪৬১২)

মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে বাম দিকে ৩ বার থুক মারবে, ৩ বার আ‘ঊযুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রজীম বলবে ও পার্শ্ব পরিবর্তন করবে।’ (মুত্তাফাকুন আলাইহি, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৬১৩-১৪ ‘স্বপ্ন’ অধ্যায়)

অন্যত্র আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, ‘স্বপ্ন তিন প্রকার হয়ে থাকে। ১. সত্য স্বপ্ন ২. মনের কল্পনা এবং ৩. শয়তানের পক্ষ হতে ভীতি প্রদর্শন। সুতরাং কেউ যদি অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে তাহলে সে যেন উঠে সালাত আদায় করে।’ (তিরমিযী, হাদীস-২২৮০; ইবনু মাজাহ, ৩হাদীস-৯০৬)

প্রশ্ন-১৯: আমরা ১৫ জন মিলে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা করে একটি মূলধন সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে থাকি। তারা ব্যবসায়িক পণ্য ক্রয় করে এবং কিস্তিতে সেই পণ্যের ক্রয়মূল্যসহ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ (যেমন ২০০০ টাকার বিনিময়ে ২২০০ টাকা) লাভ হিসাবে আমাদেরকে প্রদান করে। উক্ত ব্যবসা হালাল হবে কি? যদি হারাম হয়ে থাকে তবে আমাদের করণীয় কি?

— ইমরান, চরকুড়া, কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ

উত্তর: এরূপ ব্যবসা হালাল নয়। কারণ এ ব্যবসা রিবা আন-নাসিআহ বা বাকীতে ঋণের সূদ-এর উপর প্রতিষ্ঠিত। কেননা প্রতিষ্ঠানটি মূলতঃ বাকীতে ঋণ প্রদানের উপর অতিরিক্ত অর্থ নিচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি কেবল অর্থলগ্নিকারী, পণ্যের বিক্রেতা নয় এবং ঋণগ্রহীতার সাথে ঋণদাতার সম্পর্ক এখানে ঋণের, পণ্যের নয়। তাই আমাদের পরামর্শ আপনারা নিজেরাই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলুন। আর ইসলামে অনুমোদিত ব্যবসা দুই ধরনের। ‘মুশারাকাহ’ অর্থাৎ যার যেমন অর্থ থাকবে, সে অনুযায়ী লাভ-ক্ষতি বণ্টন হবে (আবুদাঊদ, বুলূগুল মারাম হা/৮৭০) অথবা ‘মুদরাবাহ’ অর্থাৎ একজনের অর্থ নিয়ে অপরজন ব্যবসা করবে। লাভ-ক্ষতি তাদের মাঝে চুক্তিহারে বণ্টিত হবে। (দারু কুতনী, মুওয়াত্তা, বুলুগুল মারাম, হাদীস-৮৯৫, সনদ-মওকুফ সহীহ)

প্রশ্ন-২০: আমি একজন পুলিশ সদস্য। এ সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী বড় অফিসারকে দেখলে দাঁড়িয়ে সম্মান করতে হয়। নতুবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাই বাধ্য হয়ে আমাকেও দাঁড়িয়ে সম্মান করতে হয়। প্রায় ৩৬/৩৭ বছর যাবৎ এভাবে আমি অন্যায় কর্মে সহায়তা করে যাচ্ছি। এমতাবস্থায় এ চাকরি করা আমার জন্য জায়েয হবে কি?

[নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক]

উত্তর: যিনি আপনাকে এ পাপকর্মে বাধ্য করছেন, তিনিই মূল অপরাধী। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যদি কেউ এতে আনন্দবোধ করে যে, লোকেরা তাকে দেখে স্থিরভাবে দণ্ডায়মান থাকুক, তাহ’লে সে জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নিল। (তিরমিযী, আবুদাঊদ, সনদ সহীহ, মিশকাত হাদীস-৪৬৯৯)

তাই এক্ষেত্রে আপনাকে পাপের দায়ভার নিতে হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তোমরা সাধ্যমত আল্লাহ্কে ভয় কর (তাগাবুন ৬৪/১৬)। তবে এ প্রথা বন্ধের জন্য আপনাকে সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। (মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৩৭)

[সূত্র: ইন্টারনেট]

Facebook Comments