জীবন জিজ্ঞাসার জবাব-২

 


প্রশ্ন: অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ বৈধ কি না?

এস. এম. জহির উদ্দীন, কামাল প্রতাপ, নড়াইল।

উত্তর: বিবাহ নারী ও পুরুষের মধ্যকার একটি বন্ধন। এটি সাময়িক ও ঠুনকো কোনো বন্ধন নয়। এটি নিছক ভোগ-বিলাসের উদ্দেশ্যে চঞ্চল মনের ভাবাবেগ তাড়িত কোনো বন্ধনও নয়, এটি কোনো ছেলেখেলাও নয় বরং এটি হলো, কিয়ামাত পর্যন্ত পৃথিবীতে মানব বংশের ধারা অব্যাহত রাখার এবং মানুষের সমাজ দেহকে সুস্থ, সুষ্ঠু, সুশৃংখল, পবিত্র ও শান্তিপূর্ণ রাখার মহান উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক প্রদত্ত ও নির্দেশিত নারী-পুরুষের সারাজীবনের একটি চিরস্থায়ী পূত-পবিত্র বন্ধন। এসব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিল করতে হলে এবং বিবাহের পূর্ণ সুফল পেতে হলে বিবাহের পূর্বে অনেক কিছু দেখা ও অনেক বিষয় বিবেচনায় আনা অপরিহার্য। এ জন্য কারো একার প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয় বরং সবার পক্ষ থেকে সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

ইসলাম এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত ভারসম্যপূর্ণ বিধান দিয়েছে। বিবাহ বন্ধনের বিষয়টি ইসলাম ছেলে/মেয়ের বিশেষ করে মেয়ের একার উপর যেমন ছেড়ে দেয়নি তেমনি এককভাবে অভিভাবকের উপর পূর্ণ কর্তৃত্বও ন্যস্ত করেনি। বরং ছেলে/মেয়ে ও অভিভাবকের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সমন্বিত সিদ্ধান্তের প্রতি ইসলাম সমধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। কেননা অবিবাহিত ছেলে-মেয়েদের বিয়ে-শাদীর বিষয়াদিতে বলতে গেলে কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। উপরন্তু এই বয়সে ছেলে-মেয়েরা সাধারণত চঞ্চলতা ও ভাবাবেগ দ্বারা পরিচালিত হয়। বিধায় তারা বাহ্যিক খোলস ও চাকচিক্য, মিথ্যা প্রলোভন, অভিনয়, কৃত্রিমতা প্রভৃতির ধোঁকায় পড়ে প্রভাবিত ও প্রতারিত হয়। বিশেষ করে মেয়েদেরকে এর শিকার হতে দেখা যায় বেশি। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা যথার্থভাবে নির্বাচন করতে ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে ফেলে। তাই বিয়ের উদ্দেশ্যগুলো যেমন পুরোপুরি অর্জিত হয় না তেমনি বিয়ের সুফলও তারা সঠিকভাবে লাভ করতে পারে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এই ভুলের মাশুল তাদেরকে কড়ায় গন্ডায় গুণতে হয়।

সেই ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে কত মেয়েকে যে জীবন দিতে হয়, কত মেয়ে তার মূলধনকে-সতীত্ব ও সর্বস্ব হারায়, কত মেয়ে যে অশান্তির দাবানলে দাউ দাউ করে জ্বলে, কত মেয়ে যে মানুষরূপী অমানুষের জালে আটকা পড়ে সারা জীবন অশ্রু ঝরায় তার কোনো হিসাব নিকাশ নেই। এ কারণেই ইসলাম ছেলে-মেয়েদের বিয়ে-শাদীতে পিতা-মাতা তথা অভিভাবকের ভূমিকার প্রতি অতিশয় গুরুত্ব প্রদান করেছে। কেননা ছেলে-মেয়েরাই হলো পিতামাতার আশা-ভরসা ও ভবিষ্যত, তারাই হলো পিতা-মাতার সবকিছু। ছেলে-মেয়েদের সুখ শান্তির জন্যই পিতা-মাতা তাদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে থাকেন। বলতে গেলে তারাই তাদের জান-প্রাণ।

জন্মের পর থেকে মাতা-পিতা ছেলে-মেয়েদের সুখ-শান্তি, উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য যেমন তাদের সর্বস্ব উজাড় করে দেন তেমনি দাম্পত্য জীবনেও যেনো তারা বউ/স্বামী ও সন্তান-সন্ততি নিয়ে সুখে শান্তিতে কাটাতে পারে তার জন্যও মাতাপিতার পেরেশানির কোনো অন্ত থাকে না। ছেলের জন্য একটা ভালো বংশীয় ঘরের সুন্দরী, সুশ্রী ও শিক্ষিত নম্র-ভদ্র আনুগত্যশীল মেয়ে জোগাড় করা এবং মেয়ের জন্যও অনুরূপ সুশিক্ষিত নম্র-ভদ্র ও কর্মঠ ছেলে জোগাড় করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা ও দৌড়-ঝাঁপের কোনো শেষ থাকে না, যতক্ষণ না তা জোগাড় করতে পেরেছেন। এজন্য তাদের ঘর-বাড়ী, পরিবার, বংশ-মর্যাদা, স্বভাব-চরিত্র, মেজায-তবীয়ত; পরিবেশ, শিক্ষা-দীক্ষা আচার-ব্যবহার পিতৃকুল-মাতৃকুল প্রভৃতি বিষয়সমূহ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করে জামাতা/পুত্রবধূ নির্বাচন করে থাকেন। এ ধরনের বিবাহগুলো হয় পূত-পবিত্র ও সব ধরনের নোংরামিমুক্ত। এসব বিবাহে শামিল হয় আল্লাহর খাস রহমত ও বরকত এবং পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ও দু‘আ। ফলে এদের দাম্পত্য জীবন হয় মিল-মহব্বত ও শান্তিপূর্ণ, পরিবারগুলো হয় সমৃদ্ধ। এ সম্পর্কে আল্লাহতা‘আলা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটা হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ করো। আর তিনি দয়া-মায়া সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।’ (সূরা রূম: ২১)

ছেলে-মেয়েদের বিবাহে অভিভাবকের ভূমিকার পাশাপাশি ছেলে-মেয়ে তথা বর-কনের মতামত ও পছন্দ-অপছন্দের প্রতিও ইসলাম সমধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। ছেলে-মেয়ের বিবাহে অভিভাবকগণ অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখনো যেনো স্বেচ্ছাচারী না হয়ে যায় বা ছেলে-মেয়ের মতামত ও পছন্দ-অপছন্দের প্রতি লক্ষ্য না করে এককভাবে বিবাহের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে, সেজন্য ইসলাম ছেলে-মেয়ে তথা বর-কনের মতামতের প্রতিও অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। কেননা যারা বিয়ে করবে, একইসাথে সারাটা জীবন একান্ত আপনজন হিসেবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গভাবে ঘর-সংসার করবে ও দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করবে তাদের একে অপরকে দেখা, একজন অপর জনকে পছন্দ করা ও পরস্পরের প্রতি মনের স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণে পরস্পরকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। এভাবে অভিভাবক ও ছেলে-মেয়ের মতামত ও পছন্দের সমন্বয়ে সংঘটিত বিবাহ-ই ইসলামী শরী‘আতে কাঙ্ক্ষিত ও নির্দেশিত। এক্ষেত্রে আমরা কুরআন ও হাদীস কী বলে তা আলোচনা করবো। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা পুরুষ অভিভাবকদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন (ছেলে হোক বা মেয়ে হোক) তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ তাদেরও।’ (সূরা নূর: ৩২)

তিনি আরো বলেন, ’তোমরা (তোমাদের মেয়েদেরকে) মুশরিক পুরুষদের সাথে বিবাহ দিওনা, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে।’ (সূরা আল বাকারা: ২২১)

উপর্যুক্ত আয়াত দুটিতে আল্লাহ তা‘আলা অভিভাবকদের প্রতি তাদের অধীনস্থ ছেলে-মেয়েদের বিবাহ সম্পাদন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এসম্পর্কে হাদীসে এসেছে,

আবূ মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’অভিভাবক ব্যতীত বিবাহ হয়না।’ (মুসনাদে আহমাদ, সুনানু আবু দাউদ, জামে আত-তিরমিযী: সহীহ ইবন হিব্বান, মুসতাদরাকে হাকেম)

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’যে মহিলা অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কাউকে বিবাহ করবে, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। (এভাবে বিবাহ সম্পাদিত হওয়ার পর) স্বামী যদি তার সাথে সহবাস করে তবে তার সাথে যৌন সম্ভোগ করার কারণে সে মোহরানার অধিকারী হবে। যদি অভিভাবকগণ বিবাদ করে তবে যার অভিভাবক নেই শাসকই হবে তার অভিভাবক।’ (মুসনাদে আহমাদ, সুনানু আবু দাউদ, সুনানু ইবনু মাজাহ, জামে আত-তিরমিযী) ইমাম কুরতুবী বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। এ হাদীস উম্মুল মু‘মিনীন আয়িশা (রা.), উম্মে সালামা (রা) ও যয়নাব (রা.) থেকেও সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে বলে হাকেম উল্লেখ করেছেন। ইবনুল মুনযির বলেন, এই হাদীসের বিপক্ষে কিছু পাওয়া যায়নি।

আবু দাউদ আত-তয়ালিসী অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।

আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো নারী কোনো নারীকে বিবাহ দিতে পারে না এবং কোনো নারী নিজেকেও বিবাহ দিতে পারে না। ব্যাভিচারিণী সেই নারী যে নিজেকে বিবাহ দিয়েছে। (ইবনু মাজাহ) হাফিয বলেন, এই হাদীসের বর্ণনাকারীগণ সবাই নির্ভরযোগ্য।

ইকরামা ইবন খালিদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কতিপয় মুসাফির রাস্তায় একত্র হয়। তাদের মধ্যে ছিল একজন পূর্ববিবাহিত নারী— যার দেখা-শুনার দায়িত্ব ছিল এমন এক ব্যক্তির উপর  যে তার অভিভাবক নয়। অতঃপর সে তাকে বিবাহ দেয়। এ খবর উমারের (রা.) নিকট পৌঁছলে তিনি বিবাহকারী ও বিবাহদাতাকে বেত্রাঘাত করেন এবং বিবাহটি ভেঙ্গে দেন। (ইমাম শাফিঈ ও দারাকুতনী হাদীসটি বর্ণনা করেন)

শা‘বী (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, অভিভাবক ছাড়া নারীদেরকে বিবাহ দেয়ার বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের মধ্যে আলী (রা.) ছিলেন সবচাইতে বেশি কঠোর। এ ধরনের বিবাহে জড়িতদের তিনি প্রহার করতেন। (দারাকুতনী)

ইমরান ইবন হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ওলী (অভিভাবক) ও দু‘জন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ব্যতীত বিবাহ হবে না। [আহমাদ ইবন হাম্বল (রা.) হাদীসটি উল্লেখ করেন। নাইলুল আওতার/৬৫১২]

উপরে বর্ণিত কুরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, ছেলে-মেয়েদের, বিশেষ করে মেয়েদের বিবাহে অভিভাবকের অনুমতি অত্যাবশ্যক। অভিভাবককের অনুমতি ব্যতীত মেয়েদের বিবাহ শুদ্ধ হয় না।

বিবাহ-শাদীতে যেসব বিষয় বিবেচনা করা ও নিখুঁতভাবে যাচাই বাছাই করে দেখা নিতান্ত প্রয়োজন, নানা কারণে মেয়েদের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। ফলে তারা সেসব বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকে। এছাড়া তারা চঞ্চলতা ও ভাবাবেগ দ্বারা পরিচালিত হয়। এসব কারণে এবং সাময়িক কোনো মোহে বিভ্রান্ত হয়ে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করতে ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে তারা ভুল করে ফেলে। আর এ ভুলের খেসারত নিরীহ নিরপরাধ কোমলমতি মেয়েদেরই দিতে হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারী জাতির প্রতি অতিশয় দয়াশীল ও মেহেরবান। তারা যেনো বিবাহের ক্ষেত্রে ও বৈবাহিক জীবনে কারো দ্বারা কোনোভাবে প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং কষ্ট-কঠোরতায় পতিত না হয় ও যুলুম-নির্যাতনের শিকার হতে না হয় সেজন্য ইসলাম ছেলে-মেয়ে বিশেষ করে মেয়েদের বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকার প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে।

বিবাহে অভিভাবকের অনুমতি যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের/কনের অনুমতিও প্রয়োজন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক পূর্ববিবাহিত নারীকে বিবাহ দেয়া যাবে না যতক্ষণ না তার স্পষ্ট অনুমতি নেয়া হয়। অনুরূপভাবে প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী মেয়েকেও বিবাহ দেয়া যাবে না যতক্ষণ না তার অনুমতি গ্রহণ করা হয়। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তার অনুমতি কিভাবে বুঝা যাবে? (সে তো লজ্জায় কথা বলবে না) তিনি বললেন, চুপ থাকাই তার অনুমতি। (সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম) সহীহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক পূর্ব বিবাহিত নারী-নিজের ব্যাপারে তার ওলী (অভিভাবক) অপেক্ষা অধিক হকদার। প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী মেয়ের (বিবাহের) ব্যাপারে তার পিতা তার অনুমতি গ্রহণ করবে। তার চুপ থাকা হলো তার অনুমতি।

ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী মেয়ের কাছ থেকে তার (বিবাহের) বিষয়ে তার মত গ্রহণ করা আবশ্যক। কুমারী মেয়ের নীরবতাই তার সম্মতি। (সহীহ মুসলিম)

ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। জৈনকা কুমারী মেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, তার পিতা তার অসম্মতি সত্ত্বেও তাকে বিবাহ দিয়েছে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিবাহ বাতিল বা বহাল রাখার স্বাধীনতা দিলেন। (মুসনাদে আহমাদ, সুনান আবু দাউদ, সুনানু ইবন মাজাহ, দারাকুতনী)

খানসা বিনতে খিদাম আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত। তার পিতা তাকে তার অমতে বিবাহ দিয়েছেন, অথচ তিনি ছিলেন পূর্ববিবাহিত। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অভিযোগ করলেন, ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিবাহ বাতিল করে দিলেন। (মুসলিম ব্যতীত সকল সহীহ গ্রন্থ)

আবদুল্লাহ ইবন বুরাইদা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জনৈক যুবতী এসে জানালো, তার পিতা তাকে তার ভাতিজার সাথে বিবাহ দিয়েছেন। যাতে আমার দ্বারা তার বদ-স্বভাব দূর হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার বিবাহের ব্যাপারে স্বাধীনতা দিলেন। তিনি বললেন: আমি আমার পিতা যা করেছেন তা মেনে নিয়েছি। তবে নারীদেরকে জানাতে চাই এ ব্যাপারে পিতার কোনো কর্তৃত্ব নেই। (ইবন মাজাহ)

এসব হাদীস প্রমাণ করে, প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিবাহে তাদের অনুমতি গ্রহণ করা আবশ্যক। তাদের অনুমতি ছাড়া বিবাহ দেয়া হলে সে বিবাহ তারা বহাল রাখার অথবা বাতিল করার অধিকার রাখে।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল যে, ছেলে-মেয়েদের বিবাহে বিশেষ করে মেয়েদের বিবাহে অভিভাবকের অনুমতি অত্যাবশ্যক। আভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ হয় না। অনুরূপভাবে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিবাহে তাদের অনুমতি গ্রহণ করাও আবশ্যক। ইসলাম বিবাহ-শাদীতে ছেলে-মেয়ে ও অভিভাবক উভয়ের অনুমতি গ্রহণ করা আবশ্যক করে দিয়েছে এবং উভয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা অবধারিত করে দিয়েছে, যাতে উভয়ের কেউ কাউকে বাদ দিয়ে ও উভয়ের অনুমতি ও সম্মতি ছাড়া কেউই বিবাহ সম্পাদন করার সুযোগ না পায়। বিবাহ-শাদীতে ইসলাম সন্তান ও অভিভাবকের মধ্যে সমন্বয় সাধনের যে বিধান দিয়েছে তা পালন করলে মুসলমানদের পরিবার ও সমাজ জীবনে বড় ধরনের ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং পরিবার ও সমাজ জীবন থেকে বহু অশান্তি ও বিশৃঙ্ক্ষলা দূর হবে। উপরন্তু অভিভাবক ও ছেলে মেয়েদের সম্মিলিত মতামত ও সন্তুষ্টির ভিত্তিতে সংঘটিত বিবাহসমূহে বর-কনের দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবনে পিতা-মাতা ও অভিভাবকগণের দু‘আ এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত নাযিল হবে যা কেবল তাদের জন্য কল্যাণই বয়ে আনবে। ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন: চোগলখোরী কাকে বলে? চোগলখোরী অর্থ কী? কুরআন, হাদীসে চোগলখোরীর ভয়াবহতা কী জানালে উপকৃত হবো।

নীরব, ঢাকা।

উত্তর: চোগলখোর হলো, যে ব্যক্তি আড়ালে কারো নিন্দা করে বা একজনের কাছে গিয়ে অন্যের নামে অপবাদ দেয়। চোগলখুরী কঠোর পাপ কাজ। এ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, চোগলখোর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম)

অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: এই দুই ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে, কোনো বড় গুনাহের কারণে তাদের শাস্তি হচ্ছে না। তবে হাঁ, বিষয়টি বড়ই, তাদের একজন চোগলখোরী করে বেড়াতো এবং অন্যজন পেশাবের সময় পর্দা করত না। (সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম)

চোগলখোরী এমন একটা অন্যায় ও পাপের কাজ যা সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্ক্ষলা সৃষ্টি করে এবং লোকদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদের কারণ হয়। হাদীসের বর্ণনা মতে চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং তার জন্য কবরে ও পরকালে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রশ্ন: আমি একজন অবিবাহিত বৃদ্ধ। আমার সম্পত্তির মধ্যে আছে (১) দেড় থেকে দুই গন্ডা জায়গার উপর একটি আবাসিক গৃহ, (২) গ্রামে তিন কানি ধানের জমি (কানি হলো সংশ্লিষ্ট এলাকার জমির আঞ্চলিক পরিমাপ) এবং (৩) ব্যাংকে ৪২ লক্ষ টাকা। আমি ৪২ লক্ষ টাকা সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের নামে অসিয়াত করতে ইচ্ছুক। জানতে চাই আমার অছিয়াতটি শারী‘আ সম্মত কিনা?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, চট্টগ্রাম।

উত্তর: অসিয়াত ব্যক্তির সমুদয় সম্পদের একতৃতীয়াংশের মধ্যে করার বিধান আছে। এর বেশি করার বিধান নেই। করলেও তা কার্যকরী হবে না। বরং কার্যকরী হবে এক তৃতীয়াংশের মধ্যে। অতএব, আপনি সর্বোচ্চ আপনার সমুদয় সম্পদের একতৃতীয়াংশ পর্যন্ত অছিয়াত করতে পারবেন। বুখারী ও মুসলিমসহ বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ..হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি আমার সমগ্র সম্পত্তি অসিয়াত করে দেবো? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, তাহলে অর্ধেক? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, তিনভাগের একভাগ? তিনি বললেন, ঠিক আছে। একতৃতীয়াংশ অসিয়াত করো। এক তৃতীয়াংশও অনেক।

অবশ্য আপনার যদি কোনো উত্তরাধিকারী না থাকে তখন আপনি এর বেশিও অসিয়াত করতে পারেন।

প্রশ্ন: অনেকে বলেন, সূর্যোদয়ের পর ২৩ মিনিট পর্যন্ত সালাত আদায় করা নিষিদ্ধ ও হারাম। আবার কেউ বলেন ২০ মিনিট, কেউ বলেন ১৫ মিনিট, কোনটি সঠিক?

প্রকৃত পক্ষে, নিষিদ্ধ এ সময়টি কখন থেকে কখন পর্যন্ত তা পরিষ্কার করে বিস্তারিতভাবে বলবেন কি?

আবু ইবরাহীম, ঢাকা।

উত্তর: সূর্যোদয়ের সময় সালাত আদায় করা নিষিদ্ধ। সেটা ফারয, ওয়াজিব, নফল ও জানাযা যাই হোক না কেন। এ নিষেধাজ্ঞা সূর্যোদয়ের শুরু থেকে সূর্য কিছুটা উপরে উঠা বা এক বর্শা পরিমাণ উপরে উঠা পর্যন্ত। এ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে। আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আসরের সালাতের পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনো সালাত নেই। আর ফজরের সালাতের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত কোনো সালাত নেই। (সহীহ মুসলিম)

উকবা ইবন আমির (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তিনটি সময়ে সালাত আদায় করতে ও মৃতকে দাফন করতে নিষেধ করেছেন। সূর্যোদয়ের সময় যতক্ষণ সূর্য উপরে না উঠে যায়। ঠিক দুপুরে এবং সূর্যাস্তের সময়। (বুখারী ব্যতীত সব কয়টি সহীহ হাদীস গ্রন্থ)

আমর বিন আব্বাস (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! আমাকে সালাত সম্পর্কে অবহিত করুন। তিনি বললেন, ফজরের সালাত আদায় করো, অতঃপর সূর্য উঠা পর্যন্ত বন্ধ রাখো। কেননা সূর্য শয়তানের দুই শিং-এর মাঝখান দিয়ে উঠে, সেই সময় কাফিররা সূর্যকে সাজদা করে..। (মুসনাদে আহমাদ, সহীহ মুসলিম)

ফাত্ওয়া আলমগীরীতে লিখেছে, যতক্ষণ মানুষ সূর্যের আশ-পাশ দেখতে সক্ষম হয় ততক্ষণ সূর্য উদিত হওয়ার অবস্থায় থাকে।

অন্য ভাষায় বলা যায়, সূর্য উঠার পর যতক্ষণ তা হলুদ বর্ণের দেখায় ততক্ষণ সালাত আদায় করা মাকরূহ। উল্লেখ্য যে, সূর্য উঠার পর হলুদ বর্ণ বিলুপ্ত হয়ে তাপ বিকিরণ শুরু হওয়া পর্যন্ত কিছু সময় লাগে। মৌসুমের তারতম্যের কারণে এ সময়টাও কম-বেশি হতে পারে। যেমন গ্রীষ্মকালে সূর্যের হলুদ বর্ণ বিলুপ্ত হয়ে তাপ বিকিরণ শুরু হতে শীতকাল অপেক্ষা কম সময় লাগে। আর সূর্যের তাপ বিকিরণ শুরু হয়ে গেলে তখন সূর্যের দিকে তাকানো যায় না।

অতএব, ১৫, ২০ বা ২৩ মিনিট জরুরী বা বড় কথা নয় এবং এর ব্যত্যয় ঘটতে পারবে না, এমনও নয়। মূল কথা হলো, সূর্য উঠার পর সূর্যের হলুদ বর্ণ বিলুপ্ত হয়ে তাপ বিকিরণ শুরু হওয়া। এটা গরমকালে কিছুটা তাড়াতাড়ি হয় তখন সময় কম লাগে এবং শীতকালে একটু বিলম্বে হয় তখন সময় কিছুটা বেড়ে যায়। ১৫, ২০ বা ২৩ মিনিটের তারতম্য এ কারণেও হতে পারে।

যিনি বা যারা ২৩ মিনিট বলেছেন, তিনি শীত ও গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমে সূর্যের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সালাত নিষিদ্ধ বা মাকরূহ হওয়ার এই সময়টাকে সর্ব-সাধারণের জন্য এবং সব মৌসুমের জন্য সতর্কতামূলক সময় হিসেবে নির্ধারণ করে থাকতে পারেন। এতে তিনি ভুল কিছু করেননি। কারণ একটু বিলম্বে সালাত আদায় করলে কোনো দোষ নেই বরং আগে তাড়াতাড়ি সালাত আদায় করতে গিয়ে যদি তা নিষিদ্ধ সময়ের আওতায় পড়ে যায় তাহলে সালাতটা মাকরূহ হয়ে গেল। এটা অবশ্যই কাম্য নয়। অতএব, সতর্কতা অবলম্বন করাই শ্রেয়।

প্রশ্ন৫: অন্য কোনো ধর্মের মেয়ে যদি ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তার অভিভাবক কে হবেন অর্থাৎ কার অভিভাবকত্বে তার বিবাহ সম্পন্ন হবে জানাবেন।

ডা. আবদুর রব, ফরিদপুর।

উত্তর: হাদীসে বলা হয়েছে, …যার কোনো অভিভাবক নেই, শাসক হবেন তার অভিভাবক। (দেখুন মুসনাদে আহমাদ, সুনানু আবু দাউদ, জামে আত-তিরমিযি) অতএব, অভিভাবকহীন কোনো মেয়ের অভিভাবক হবেন সরকার বা সরকারের স্থানীয় কোনো প্রতিনিধি।

[প্রশ্নসমূহের জবাব দিয়েছেন: মুফতী মাওলানা আবদুল মান্নান]

Facebook Comments