রাসূল (সা.)-কে ভালবাসার প্রমাণ

মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বশেষ, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। আল্লাহর নবী ও রাসূল হিসাবে তাঁর উপর ঈমান স্থাপন ও তাঁকে নিজের চেয়েও বেশি ভালবাসা একজন মুমিনের একান্ত কর্তব্য। পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফের একাধিক বর্ণনায় মুমিনদেরকে রাসূল (সা.)-এর প্রতি নিরংকুশ ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান যাকে তোমরা পছন্দ কর— আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তার নিজ ফয়সালা প্রকাশ করেন। আর আল্লাহ অবাধ্যদের পথ প্রদর্শন করেন না।’ (আত-তাওবা: ২৪)

তিনি আরো বলেন, ‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক ঘনিষ্ঠ’ (সূরা আল আহযাব: ০৬)। নবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চাইতে প্রিয় হই।’ (বুখারী ও মুসলিম)

আবদুল্লাহ ইবনে হিশাম (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (সা.)-এর সাথে ছিলাম। নবী (সা.) উমার (রা.)-এর হাত ধরা ছিলেন। অতঃপর উমার (রা.) রাসূল (সা.)-কে বললেন, হে রাসূল! আমি আপনাকে সবচাইতে বেশি ভালবাসি, তবে আমার নিজের চাইতে বেশি নয়। নবী (সা.) বললেন, তাহলে হবে না; আল্লাহর শপথ! তোমার নিজের চাইতেও আমাকে বেশি ভালবাসতে হবে। তখন উমার (রা.) বললেন, এখন আমি আপনাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালবাসি। অতঃপর নবী (সা.) বললেন, হে উমার তাহলে এখন ঠিক আছে।’ (সহীহুল বুখারী)

 

রাসূল (সা.)-কে ভালোবাসার নমুনা

মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে হৃদয়ে ও বিশ্বাসে; যার প্রতিচ্ছবি দেখা যায় তার আচার-আচরণ ও কর্মে। নবী (সা.)-কে ভালোবাসলে তার আলামত নিশ্চয়ই আমাদের কাজে-কর্মে থাকতে হবে। যারা নবী (সা.)-কে ভালোবাসেন তাদের মধ্যে নিম্নের আলামতগুলো বিদ্যমান থাকা আবশ্যক।

এক. রাসূল (সা.)-কে সম্মান করা: এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তো আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষ্য প্রদানকারী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে। যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং রাসূলকে সাহায্য কর ও সম্মান কর এবং সকালে সন্ধ্যায় আল্লাহর তাসবীহ পাঠ কর।’ (আল-ফাতহ: ৮-৯)। আমাদেরকে সব সময় নবী (সা.)-কে সম্মান করতে হবে। নবী (সা.) যতটুকু মর্যাদার হকদার, আমাদেরকে ততটুকুই মর্যাদা দিতে হবে, এতে কোন কার্পণ্য করা যাবে না। রাসূল (সা.)-কে সম্মান করতে গিয়ে আমাদেরকে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবে। যেমন—

ক. নবী (সা.)-এর সামনে উঁচুস্বরে কথা না বলা: নবী (সা.) যখন জীবিত ছিলেন তখন তাঁর সামনে উঁচু আওয়াজেও কথা বলা নিষেধ ছিল। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘হে তোমরা যারা ঈমান এনেছো! তোমরা তোমাদের কণ্ঠস্বরকে রাসূলের কণ্ঠস্বরের উপর উঁচু করো না এবং তোমরা তাঁর সাথে এমন উঁচুস্বরে কথা বলো না; যেমন তোমরা একে অপরের সাথে উচুস্বরে কথা বলে থাক। এতে তোমাদের কর্মফল বিনষ্ট হয়ে যাবে, অথচ তোমরা টেরও পাবে না।’ (আল হুজুরাত: ০২)

তিনি আমাদের মাঝে এখন আর বিদ্যমান না থাকলেও তাঁর কথামালা রয়ে গেছে। তাই কুরআনের এ আয়াতের দিকে লক্ষ্য রেখে রাসূল (সা.) নিসৃত বাণী মনোযোগ ও সম্মানের সাথে শুনতে হবে এবং তা যথাযথভাবে আমল করতে হবে। রাসূলের কোন কথাকেই বিকৃত করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হবে। যে সমস্ত দায়ী ইলাল্লাহ ও আলেমে দ্বীন রাসূলের বাণী প্রচার করেন; তাঁদেরকেও সম্মান করতে হবে।

খ. রাসূল (সা.)-এর উপর সালাত ও সালাম পড়া: নবী (সা.)-এর উম্মাতের কর্তব্য হচ্ছে— রাসূল (সা.)-এর উপর সালাত ও সালাম পেশ করা। এটি তাঁদের উপর ফরয।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফিরিস্তাগণ নবীর উপর সালাম পেশ করে। অতএব, হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর উপর সালাত ও সালাম পেশ কর।’ (আল-আহযাব: ৫৭)

এ প্রসঙ্গে নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তির সামনে আমার নাম উচ্চারিত হল; অথচ সে আমার উপর সালাম পেশ করল না সে কৃপণ।’ (আহমাদ)

তিনি এ প্রসঙ্গে আরো বলেন, ‘তার নাক ধুলি মলিন হোক, যে আমার নাম শুনেও আমার উপর সালাম পেশ কররো না।’ (আহমাদ)

দুই: রাসূল (সা.) ও তাঁর সুন্নাতকে সমুন্নত রাখা: রাসূল (সা.)-কে ভালবাসার অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে— তাঁকে এবং তাঁর সুন্নাতকে সবসময় সমুন্নত রাখার চেষ্টা করা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: ‘এ সম্পদে হক রয়েছে মুহাজিরদের, যারা নিজেদের ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদ থেকে উৎখাত হয়েছে। তারা কেবল অন্বেষণ করে আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি এবং তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্য করে। তারাই তো সত্যবাদী।’ (সূরা আল হাশর: ০৮) সাহাবীগণ রাসূল (সা.)-কে ও তাঁর সুন্নাতকে জান-প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। সবকিছুর উর্ধে রাসূলকে মর্যাদা দিতেন। তাঁর আদেশ-নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করতেন। রাসূলের আদর্শকে সমুন্নত রাখাই ছিল তাঁদের একমাত্র সাধনা। সাহাবায়ে কিরামের জিন্দেগী পর্যালোচনা করলে তাঁদের রাসূল প্রেমের অসংখ্য নজির দেখতে পাওয়া যায়। রাসূলের জন্য তাঁরা তাঁদের জীবন কুরবান করে ইতিহাস রচনা করেছেন। আমাদেরকেও তাই রাসূলের আদর্শ ও তাঁর সুন্নাতকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করতে হবে। রাসূল (সা.) এর সুন্নাতকে সমুন্নত রাখার অর্থ হচ্ছে— রাসূলের সুন্নাত সব জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করা, একে বিশুদ্ধ রাখা, এর অপপ্রয়োগ না করা, অপব্যাখ্যা না করা ও চরমপন্থী ও বিদয়াতপন্থীদের হাত থেকে রক্ষা করা। আর যারা রাসূলের হাদীস কেন্দ্রিক বিভিন্ন সন্দেহ ও অপবাদ প্রচার করে তাদের বিরুদ্ধে সঠিক জবাব দেয়া। তাদের মিথ্যা প্রচারণাকে মানুষের সামনে যুক্তি দিয়ে অসার প্রমাণ করা।

তিন: রাসূল (সা.) যা বলেছেন তা সত্য বলে মেনে নেয়া: ঈমানের অন্যতম দাবী হচ্ছে— রাসূল (সা.) কে সকল প্রকার মিথ্যা ও অপবাদের উর্ধে রাখা। তিনি যা বলেছেন সত্য বলেছেন, এই বিশ্বাস হৃদয়ে ধারণ করা। তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যা খবর দিয়েছেন তাকে সত্য জানা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নক্ষত্রের কসম, যখন অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি। এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। কুরআন অহী, যা প্রত্যাদেশ হয়।’ (সূরা আন নাজম: ১-৪)

নবী (সা.)-কে অপবাদ দেয়া ও তাঁর কথাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা কুফরী। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা মুশরিকদেরকে নিন্দা জ্ঞাপন করে বলেন, ‘আর কুরআন সে জিনিস নয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ তা বানিয়ে নেবে। অবশ্য এটি পূর্ববর্তী কালামের সত্যায়ন করে এবং সেই সকল বিষয়ের বিশ্লেষণ দান করে যা তোমার প্রতি দেয়া হয়েছে, যাতে কোন সন্দেহ নেই— তোমার বিশ্বপালনকর্তার পক্ষ থেকে। মানুষ কি বলে যে, এটি বানিয়ে এনেছ? বলে দাও, তোমরা নিয়ে এসো এর সমতুল্য একটি সূরা, আর ডেকে নাও, যাদেরকে নিতে পারো আল্লাহ ব্যতীত, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ (সূরা ইউনুস: ৩৭-৩৮)

চার: রাসূল (সা.) এর অনুসরণ ও আনুগত্য: রাসূল (সা.)-কে মহব্বত করার অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে— নবী (সা.) যা বলেছেন এবং যা করেছেন তার পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ ও আনুগত্য করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।’ (সূরা আল-আহযাব: ২১)

রাসূল (সা.)-এর আনুগত্য করা ফরজ। এ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের অনেক নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক।’ (সূরা আল-হাশর:৭)

আল্লাহ তায়ালা রাসূলের আনুগত্যকে তাঁর আনুগত্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন: ‘যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে সে আল্লাহর আনুগত্য করে।’ (সূরা আন-নিসা: ৮০) রাসূল (সা.)-এর আনুগত্যের বিষয়ে অনেক হাদীস বিধৃত হয়েছে। নবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে— আমার এবং খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাতকে আকড়ে ধরা। এবং তা শক্তভাবে দাঁত কামড়িয়ে যেভাবে ধরে সেভাবে ধরবে। সাবধান! তোমরা ধর্মের মধ্যে নতুন বিষয় থেকে দূরে থাকবে। নিশ্চয়ই প্রত্যেক নতুনত্বই (ধর্মের মধ্যে) বিদয়াত। আর প্রত্যেক বিদয়াতই ভ্রষ্টতা।’ (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযী)

অতএব, প্রত্যেক কাজে রাসূলের অনুগত্য করাই হচ্ছে রাসূলের মহব্বত। আর তাই রাসূলের মহব্বত যত বাড়বে রাসূলের আনুগত্যও তত বাড়বে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহও তোমাদিগকে ভালবাসেন।’ (সূরা আল-ইমরান: ৩১)

পাঁচ: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-কে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী হিসেবে মেনে নেওয়া: মানব সমাজ বিবাদের উর্ধে নয়। সমাজের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন বিষয়ে মতদ্বৈততা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে এই বিবাদ মিটানোর জন্য আমাদেরকে রাসূল (সা.)-এর নীতি অনুসরণ করতে হবে। তিনি যে পথনির্দেশ দেখিয়েছেন সেটিকেই চূড়ান্ত হিসেবে মেনে নিতে হবে। রাসূল (সা.)-কে ভালবাসার এটিও একটি নজির। যিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সর্ববিষয়ে শালিস মানতে পারেন না তিনি মুসলমান দাবি করতে পারেন না।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রাসূলের এবং তাদের যারা তোমাদের মধ্যে ফয়সালার অধিকারী। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে মতভেদ কর, তবে তা প্রত্যর্পণ কর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে— যদি তোমরা ঈমান এনে থাক আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি। আর এটাই উত্তম এবং পরিণামে কল্যাণকর।’ (সূরা আন-নিসা: ৫৯)

তিনি আরও বলেন, ‘তবে না; আপনার রবের কসম! তারা মুমিন হবে না যে পর্যন্ত না তারা আপনার উপর বিচারের ভার অর্পণ করে সেসব বিবাদ-বিসম্বাদের যা তাদের মধ্যে সংঘটিত হয়, তারপর তারা নিজেদের মনে কোনরূপ দ্বিধা-সংকোচ বোধ না করে আপনার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।’ (সূরা আন-নিসা: ৬৫) যারা নিজেদেরকে মুসলমান দাবি করে অথচ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফয়সালা মেনে নেয় না তারা মূলতঃ মুনাফিক; ইসলামের সাথে তাঁদের সম্পর্ক থাকতে পারে না।

আল্লাহ বলেন: ‘আপনি তাদের দেখেননি যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাসী? অথচ তারা বিচারপ্রার্থী হতে চায় তাগুতের কাছে, যদিও তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করতে। আর শয়তান তাদের পথভ্রষ্ট করে বহু দূরে নিতে চায়। আর যখন তাদের বলা হয়, এসো আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার দিকে এবং রাসূলের দিকে, তখন আপনি মুনাফিকদের দেখবেন আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুখ ফিরিয়ে সরে যাচ্ছে। (সূরা আন-নিসা: ৬০-৬১)

 

রাসূল (সা.)-কে ভালবাসার নামে বাড়াবাড়ি

আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন যারা রাসূল (সা.)-কে মহব্বত করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করেন। অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। রাসূল মাটির তৈরি নয়, তিনি গায়েব জানেন, দুনিয়া ও আদম সৃষ্টির আগে রাসূলকে সৃষ্টি করা হয়েছে, নবী (সা.) কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক এরকম অসংখ্য অশুদ্ধ কথা বাজারে প্রচলিত আছে। এই সমস্ত বাড়াবাড়ি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল পছন্দ করেন না। আল্লাহ বলেন, ‘আর এটিই আমার সরল সঠিক পথ, অতএব তোমরা এ পথেই চল, বক্র পথে চলো না। চললে সেসব পথ তোমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।’ (সূরা আল-আনয়াম: ১৫৩)

নবী (সা.) তাঁর সম্পর্কে অতিরিক্ত প্রশংসা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন: ‘তোমরা আমার অতিরিক্ত প্রশংসা করো না; যেভাবে ইহুদীরা ঈসা ইবনে মরিয়মকে নিয়ে করেছে। আমি কেবল আল্লাহর বান্দা। অতএব তোমরা বল: আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। (বুখারী) আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: ‘একদা এক ব্যক্তি নবী (সা.)-কে বললেন: আপনি এবং আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে। তখন নবী (সা.) বলেন: তুমি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে ফেললে; বরং তুমি বল, একমাত্র আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে।’ (আহমাদ) এভাবে অনেক হাদীসে নবী (সা.) তাঁকে নিয়ে অতিরিক্ত ভক্তি, প্রশংসা ও যে কোন ধরনের বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন।

পরিশেষে আমি সকল মুসলিম ভাই-বোনদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে, রাসূল (সা.)-কে আমাদের হৃদয় দিয়ে ভালবাসতে হবে; কিন্তু সে ভালবাসা যেন হয় শরীয়তের গণ্ডির মধ্যে থেকেই। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা রাসূল (সা.)-কে ভালবাসতে গিয়ে এমন কথা বলেন বা বিশ্বাস রাখেন যা মূলতঃ আল্লাহর শানে মানায়। এরকম কথা ও বিশ্বাসকে পরিহার করে রাসূল (সা.) যা করতে বলেছেন এবং তিনি যা করেছেন তার হুবহু অনুকরণ করতে পারলেই তাঁর পরম ভালবাসার পাত্র হওয়া যাবে, অন্যথায় নয়।

মনে রাখা দরকার, রাসূলের নামে মিলাদ-মাহফিল কিংবা রাসূল (সা.)-এর নাম শুনে মুখে আঙ্গুল নিয়ে চুমু খেয়ে চোখে লাগানো ও জশনে জুলুস করা যত প্রয়োজন তাঁর চেয়ে বেশি প্রয়োজন মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, বছরে একবার রমজান মাসে শুদ্ধভাবে রোযা রাখা, ইসলামের বিধান মানা, হারাম থেকে দূরে থাকা, সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজে বাধা দেয়া, ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রের মধ্যে ইসলাম কায়েমের চেষ্টা করা। এগুলোর মধ্যেই রাসূলকে পাওয়া যাবে; পাওয়া যাবে তাঁর মহব্বত।

রাসূল (সা.)-এর নামে মিলাদ-মাহফিল করলাম কিন্তু তাঁর আদর্শকে বুকে ধারণ করতে পারলাম না এটি দুঃখজনক। আমি যাকে ভালবাসব তাকে তার পছন্দ অনুযায়ী ভালবাসতে হবে; না হয় ভালবাসা হয় না; হয় প্রতারণা। রাসূলকে ভালবাসতে হলে তাই রাসূলের নির্দেশিত পন্থায়ই তাঁকে ভালবাসতে হবে; নচেৎ এই সমস্ত নেফাকী ভালবাসা দিয়ে আল্লাহর রেজামন্দি হাসিল সম্ভব নয়; নয় রাসূলের খাঁটি উম্মত হওয়া। আল্লাহ আমাদেরকে রাসূল (সা.)-এর পরিশুদ্ধ ভালবাসা অর্জনের তাওফীক দিন। আমীন!

মুহাম্মদ আমিনুল হক
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।

Facebook Comments