কুরআনের পরিচয়

কুরআন  অন্যান্য বইয়ের মধ্যেপার্থক্য

আমরা ৩০ পারায় ১১৪টি সূরা নিয়ে সংকলিত আকারে একটি বড় কিতাব বা গ্রন্থ বা পুস্তক বা বই হিসেবেই কুরআনকে দেখতে পাই।

বই বলতে আমরা সাধারণতঃ বুঝি—

১. কাগজে ছাপানো বাঁধাই করা একটি জিনিস।

২. এর একটি নাম থাকতে হবে।

৩. বইটি কয়েকটি চ্যাপ্টার বা অধ্যায়ে ভাগ করা থাকলে প্রত্যেক অধ্যায়েরই আলাদা নাম থাকবে।

৪. এক অধ্যায়ে অনেক বিষয় আলোচনা করা হয় না।

৫. একই ধরনের বিষয় ও কথা বারবার লিখা হয় না।

বই সম্পর্কে আমাদের ধারণা মূলত এটাই।

কুরআনকে আমরা লিখিত বই হিসেবেই দেখতে পাই, এর নামও রয়েছে। ১১৪টি অধ্যায়ের (সূরা) আলাদা আলাদা নামও দেখতে পাই। কিন্তু দুনিয়ার অন্য সব বইয়ের সাথে এর কোনো মিল নেই। বইয়ের মতো দেখলেও সবদিকেই বেমিল দেখা যায়। যেমন—

১. আমরা কাগজে বাঁধাই করা অবস্থায়ই কুরআনকে দেখি, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা এ অবস্থায় একটি বই হিসেবে কুরআনকে লিখে পাঠাননি।

২. অন্য সব বইয়ের নাম থেকে বোঝা যায়, বইটিতে কী বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এতে কি ইতিহাস, ভূগোল, অংক না সাহিত্য রয়েছে। কিন্তু ‘কুরআন’ নাম থেকে এর আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে কিছুই বোঝা যায় না। কুরআনের আরো কয়েকটি নাম আছে যেমন—  আল ফুরকান, আল হিকমা, আশ সিফা, বুরহান, আন নূর যার কোনোটাই বিষয়ভিত্তিক নয়; এর সব কয়টি নামই পরিচয়মূলক ও গুণবাচক।

৩. অন্য সব বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ের নামও বিষয়ভিত্তিক। যে অধ্যায়ে যে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তাও এর নাম থেকে জানা যায়। কিন্তু কুরআনের সূরাগুলোর নাম থেকে আলোচ্য বিষয় বোঝা যায় না। এ নামও পরিচয়মূলক মাত্র।

৪. সাধারণতঃ কোনো বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে একই বিষয়ের আলোচনা থাকে না, কিন্তু কুরআনে একই বিষয় একাধিক সূরায় পাওয়া যায়।

৫. কোনো বইতেই বারবার একই কথা বিভিন্ন পৃষ্ঠায় লেখা থাকে না, কিন্তু কুরআনে একই কথা বহুবার বিভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই অন্য সব বইয়ের মতো একটা বই মনে করে যদি কেউ কুরআন বোঝার চেষ্টা করে, তাহলে সে তা থেকে কিছুই বুঝতে পারবে না। বই বললে সবাই যা বুঝে কুরআন সে ধরনের কোনো বই নয়। তাহলে প্রথমেই জানতে হবে, কুরআন কোন্ ধরনের বই এবং একে বুঝতে হলে কীভাবে পড়তে হবে?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স যখন ৪০ বছর তখন রমাদান মাসের শেষ ১০ রাতের কোন এক বেজোড় রাতে মক্কা থেকে একটু দূরে মিনা নামক জায়গায় পাথরের এক উঁচু পাহাড়ের মাথায় একটি গুহায় প্রথম তাঁর উপর ওহী নাযিল হয়েছিল। জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর তরফ থেকে রাসূল (সা.)-এর উপর ওহী নাযিল করা শুরু করেছেন। সেদিন থেকে রাসূল (সা.)-এর নবুওয়াতী জীবন শুরু হলো। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছর এভাবেই তিনি কিছু কিছু করে ওহীর মারফতে আল্লাহর বাণী পেয়েছিলেন।

এসব বাণী জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) রাসূল (সা.)-কে পড়ে শোনাতেন এবং তিনি তা মুখস্থ করে নিতেন। লিখিত কোনো জিনিস তাঁকে দেয়া হতো না। কিন্তু তিনি যে অংশটুকু যখন পেতেন তখনই তা সাহাবায়ে কেরামকে পড়ে শোনাতেন। তাঁরাও তা মুখস্থ করে নিতেন। কয়েক জন সাহাবীকে এসব আয়াত লিখে রাখার দায়িত্বও দেয়া ছিল। এভাবে দীর্ঘ ২৩ বছরে অল্প অল্প করে যত ওহী রাসূল (সা.)-এর উপর নাযিল হয়েছে তার সমষ্টিই হলো কুরআন।

তাহলে বোঝা গেল, কুরআন একসাথে একটা বই হিসেবে দেয়া হয়নি। লিখিত আকারেও আসেনি। বক্তৃতা, বিবৃতি বা ভাষণ হিসেবেই জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) পেশ করেছেন এবং রাসূল (সা.)ও মুখে সেভাবেই তিলাওয়াত করে সাহাবায়ে কেরামকে শুনিয়ে দিয়েছেন। কোন্ আয়াতের পর কোন্ আয়াত বসানো হবে এবং কোন্ সূরার পর কোন্ সূরা সাজানো হবে সবই আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) রাসূল (সা.)-কে জানিয়ে দিতেন। রাসূল (সা.) দুনিয়ায় থাকাকালেই কিছু সংখ্যক সাহাবী পুরো কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। মুখস্থ করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারতীব (নিয়ম) অনুযায়ী সাজানো থাকতে হবে।

সুতরাং বোঝা গেল, বর্তমানে আমরা আয়াত ও সূরাগুলো যেমন সাজানো অবস্থায় দেখতে পাই, এটা রাসূল (সা.) নিজেই করে গেছেন। অবশ্য এ কথা ঠিক যে, একসাথে একটি বিরাট বই হিসেবে কুরআন তখনো তৈরি হয়নি। যাদের উপর রাসূল (সা.) ওহী লিখে রাখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন তারা বিভিন্ন জিনিসের মধ্যে লিখে রাখতেন। আবূ বকর (রাদিআল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতকালে যুদ্ধের ময়দানে অনেক হাফিযে কুরআন শহীদ হওয়ায় ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু)-এর পরামর্শে কুরআনকে একটি গ্রন্থের আকারে তৈরি করা হয়। রাসূল (সা.)-এর সময় যাঁরা ওহী শোনার সময়ই লিখে রাখতেন তাঁদের সংখ্যা ছিল ৪২ জন। রাসূল (সা.) যাঁকে বিশেষভাবে লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন তিনি হলেন যায়েদ ইবনে সাবিত (রাদিআল্লাহু আনহু)। তাই আবূ বকর (রাদিআল্লাহু আনহু) যায়েদ (রাদিআল্লাহ আনহু) এর উপর এ মহান দায়িত্ব দিলে তিনি ওহীর লেখকগণ ও প্রসিদ্ধ হাফিজগণের সাহায্যে এবং তাঁদের মতামত নিয়ে কুরআনকে একটি গ্রন্থের আকারে তৈরি করেন।

ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু) ও উসমান (রাদিআল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতকালে পৃথিবীর অনেক দেশে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটায় বিভিন্ন অঞ্চলে কুরআন তিলাওয়াতের উচ্চারণে পার্থক্য দেখা দেয় এবং যে দেশে যে রকমের উচ্চারণে পড়া হচ্ছিল, সে উচ্চারণেই কুরআন লিখা হতে থাকে। এতে সারা দুনিয়ায় কুরআনের অক্ষর ও উচ্চারণের মধ্যে বিভিন্নতা দেখা দেয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। উসমান (রাদিআল্লাহু আনহু) এ অবস্থা থেকে কুরআনকে হিফাযত করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। আবূ বকর (রাদিআল্লাহু আনহু)-এর সময় যে সংকলন তৈরি করা হয়েছিল তা তিনি হুবহু নকল করে সব দেশের শাসনকর্তার নিকট পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন এবং পাঠানো গ্রন্থের অনুকরণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আজ সারা দুনিয়ায় ‘কুরআন’ নামে যে মহাগ্রন্থটি তিলাওয়াত করা হয় তা ঐ মূল গ্রন্থ থেকেই তৈরি করা হয়েছে।

কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য

কুরআনকে সঠিকভাবে ও সহজে বুঝতে হলে এ কথাটি জানতে হবে যে, আল্লাহ তা‘আলা কী উদ্দেশ্যে এ কিতাব নাযিল করেছেন। মানবজাতির আদিপিতা আদম (আলাইহিস সালাম) ও আদিমাতা হাওয়া (আলাইহিস সালাম)-কে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় পাঠানোর সময় তারা শয়তানের ভয়ে অস্থির হয়ে গিয়েছিলেন। যে শয়তান এত কৌশল ও যোগ্যতার সাথে তাঁদেরকে জান্নাতে পর্যন্ত ধোঁকা দিতে পেরেছে, দুনিয়ায় না জানি ঐ শত্রুর হাতে কী দুর্গতি হয় এ আশঙ্কায়ই তাঁরা চিন্তিত হয়ে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন,

“আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হিদায়াত আসবে। যারা ঐ হিদায়াত মেনে চলবে তাদের কোনো ভয় নেই। আর তাদের ভাবনার কোনো কারণও নেই।” (সূরা বাকারা: ৩৮)

আল্লাহ তা‘আলার ঐ ঘোষণা অনুযায়ী মানবজাতিকে সঠিক পথে চলার সুযোগ দেয়ার উদ্দেশ্যেই নবী ও রাসূলগণের নিকট যুগে যুগে কিতাব পাঠানো হয়েছে। শয়তানের ধোঁকা, নাফসের তাড়না ও দুনিয়ার মোহ থেকে বেঁচে থেকে আল্লাহর হুকুম ও রাসূল (সা.)-এর তরীকা অনুযায়ী যারা চলতে চায়, তাদেরকে সব যুগেই আল্লাহর কিতাব সরল ও সঠিক পথ দেখিয়েছে। আল কুরআন আল্লাহর ঐ মহান কিতাবেরই সর্বশেষ সংস্করণ এবং যাঁর উপর এ কিতাব নাযিল হয়েছে তিনিও সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল (সা.)।

তাহলে বোঝা গেল, দুনিয়ার জীবনটা কীভাবে কাটালে দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তি পাওয়া যাবে—  সে কথা শিক্ষা দেয়ার জন্যই কুরআন এসেছে। দুনিয়াদারি বাদ দিয়ে বৈরাগী, সন্ন্যাসী ও দরবেশ হওয়ার শিক্ষা দিতে কুরআন আসেনি। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে ঘর-সংসার, রুজি-রোজগার, বিয়ে-শাদি, খেত-খামার, ব্যবসা-বাণিজ্য, শাসন-বিচার, যুদ্ধ-সন্ধি ইত্যাদি যত কিছু মানুষকে করতে হয় সবই যাতে আল্লাহর হুকুম ও রাসূল (সা.)-এর তরীকা অনুযায়ী এসব করা হলে দুনিয়াদারিও দ্বীনদারিতে পরিণত হয়। আর ঐসব কাজ যদি মনগড়া নিয়মে করা হয়, তাহলে সবই শয়তানের কাজ বলে গণ্য। মুমিনের জীবনে দ্বীনদারি ও দুনিয়াদারি আলাদা নয়। আল্লাহর হুকুম ও রাসূল (সা.)-এর তরীকা অনুযায়ী চললে গোটা জীবনের সব কাজই দ্বীনদারি বলে গণ্য।

রাসূল (সা.)-এর দায়িত্ব কী?

আল্লাহ তা‘আলা যে রসূলের উপর কুরআন নাযিল করেছেন তাঁকে দুনিয়ার কোন্ দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন তা কুরআনেরই তিনটি সূরায় স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, “তিনিই ঐ সত্তা, যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, যাতে (রাসূল) ঐ দ্বীনকে অন্য সব দ্বীনের উপর বিজয়ী করেন।” (সূরা তাওবা: ৩৩, সূরা ফাত্‌হ: ২৯ ও সূরা সফ: ৯)

এ আয়াত থেকে জানা গেল, কুরআনই ঐ হিদায়াত ও সত্য দ্বীন (দ্বীনে হক), যাকে মানুষের মনগড়ার মত, পথ ও বিধানের উপর বিজয়ী করার কঠিন ও মহান দায়িত্ব দিয়ে শেষ নবীকে পাঠানো হয়েছে। এ দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে হলে ‘দ্বীন’ শব্দের আসল অর্থ জানতে হবে।

‘দ্বীন’ শব্দের মূল অর্থ আনুগত্য বা মেনে চলা ছাড়া মানুষের উপায় নেই। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনসহ ছোট-বড় সব ব্যাপারেই কতক নিয়ম, আইন ও বিধান মেনে চলতে হয়। এসব আইন বানানোর সুযোগ যারা পায়, তারা সবার প্রতি ইনসাফপূর্ণ বিধান তৈরি করতে পারে না। সঠিক জ্ঞানের অভাবে বা দলগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের কারণে এসব বিধানের দ্বারা মানুষ শোষণ, যুলুম ও অশান্তি ভোগ করে। মানবরচিত এসব বিধানেও ঐ আয়াতে দ্বীন বলা হয়েছে। কেননা, সব বিধানই মানুষের নিকট আনুগত্য দাবি করে এবং মানুষ তা মেনে চলতে বাধ্য হয়।

আল্লাহ তা’আলা মানবজাতিকে মানুষের দ্বীনের শোষণ, অত্যাচার ও অশান্তি থেকে মুক্তি দেয়ার দায়িত্ব দিয়েই রাসূল (সা.)-কে ‘দ্বীনে হক’সহ পাঠিয়েছেন। মানুষ যেন আল্লাহর দ্বীনকে মেনে চলার সুযোগ পায় এবং অন্য কোনো দ্বীনের আনুগত্য করতে যেন বাধ্য না হয়, সে মহান উদ্দেশ্যেই রাসূল (সা.)-কে পাঠানো হয়েছে। রাসূল (সা.) দীর্ঘ ২৩ বছরের কঠোর সাধনা, ত্যাগ ও কুরবানীর মাধ্যমে অত্যন্ত সফলতার সাথে এ কঠিন দায়িত্ব পালন করেছেন। ইতিহাসই এর উজ্জ্বল সাক্ষী।

কুরআন রাসূল (সা.)-এর সংগ্রামী জীবনেরইগাইড বুক

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে যে বিরাট, কঠিন ও মহান দায়িত্ব দিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, সে দায়িত্ব সঠিকভাবে ও সাফল্যের সাথে পালন করার জন্য যখন যতটুকু হিদায়াত দরকার ততটুকুই ওহীযোগ রাসূল (সা.)-কে জানানো হয়েছে। এভাবে সে কাজটিকে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় হিদায়াত সমাপ্ত হতেও এ পুরো ২৩ বছরই লেগেছে। কুরআন ঐসব হিদায়াতেরই সমষ্টি। এ কারণেই কুরআনকে রাসূল (সা.)-এর সংগ্রামী জীবনের দিশারি বা গাইড বুক বলা হয়।

যে কাজটি রাসূল (সা.) ২৩ বছরে সমাধা করেছেন তা এমন ধরনেরই কাজ ছিল, যা তাঁর জীবনকে সংগ্রামী হতে বাধ্য করেছে। জনগণকে কতক মানুষের গোলামি থেকে মুক্তি দিয়ে একমাত্র আল্লাহর গোলাম হিসেবে জীবনযাপন করার সুযোগ দেয়ার কাজই তিনি করেছেন। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারা, গাছ-পালা, নদী-নালা, আগুন-পানি, পাহাড়-পর্বত, জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গসহ গোটা সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর বিধান মেনে চলে বলেই শান্তিতে আছে। মানুষও যদি তাঁরই বিধান মেনে চলার সুযোগ পায় তবেই তারা সত্যিকার শান্তি পেতে পারে। কিন্তু কতক মানুষ তাদের মনগড়া নিয়ম-কানুন জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়ে আইন-শৃঙ্খলার নামে জনগণকে তাদের গোলাম বানিয়ে রাখে এবং অশান্তি ভোগ করতে বাধ্য করে। আল্লাহ তা‘আলা মানুষের এ গোলামি থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্তি দেয়ার দায়িত্ব দিয়েই যুগে যুগে নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। তাই দেখা যায়, সব নবীকেই ঐসব লোক পদে পদে বাধা দিয়েছে, যারা জনগণের উপর মনিব সেজে বসেছিল। তারা নিজেদের স্বার্থেই রীতিনীতি, বিধি-বিধান ও রসম-রেওয়াজ সমাজে চালু করেছে। এসবকে অমান্য করে আল্লাহর আইন মানার দাওয়াত যখনই কোনো নবী দিয়েছেন তখনই ঐসব স্বার্থবাদীরা বাধা দিয়েছে। এ কারণেই নবীদেরকে জীবনে বড়ই কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। বহু নবীকে হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে। একমাত্র দু’জন নবী ছাড়া সবাইকে আজীবন সংগ্রাম করতে হয়েছে। এঁদের একজন আদম (আলাইহিস সালাম), যাঁর আগে কোনো মানবসমাজ ছিল না। তাই তাঁকে বাধা দেয়ারও কেউ ছিল না। আর অন্য জন সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) বিনা বাধায় নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছেন।

সুতরাং স্বাভাবিক এবং ইতিহাসের গতিধারার রাসূল (সা.)-কে এক কঠিন সংগ্রামী জীবন কাটাতে হয়েছে। আর এ সংগ্রামী জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কুরআন তাঁকে গাইড করেছে।

রাসূল (সা.)-এর সংগ্রামী জীবনের পটভূমি

রাসূল (সা.) মক্কায় জন্মগ্রহণ করেছেন। সে যুগে মক্কার কুরাইশদেরকে গোটা আরবের মানুষ সম্মান করত। কুরাইশদের এক শাখার নাম হাশেমী বংশ। রাসূল (সা.) এ বংশেরই সন্তান ছিলেন। কুরাইশনেতারা কাবাঘরের খাদিম ছিল বলেই সবাই তাদেরকে সম্মান করত। তাদের মনগড়া আইনই সমাজে চালু ছিল। তারাই কা’বাঘরে ৩৬০টি দেব-দেবীর মূর্তিপূজা করত। মানুষকে তারা তাদের আইনের গোলাম বানিয়ে রেখেছিল। রাসূল (সা.) সমাজের এ দুর্দশা, মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও জোর-যুলুম দেখে দুঃখবোধ করতেন। যুবক বয়সে আরো কতক যুবককে নিয়ে ‘হিলফুল ফুযূল’ নামে এক সমিতির মাধ্যমে সমাজ কল্যাণমূলক কাজ করতে গিয়ে সমাজের সমস্যা সম্পর্কে আরো বেশি করে জানতে পেরেছেন। সমিতির মাধ্যমে বিধবা ও ইয়াতীমদেরকে সাহায্য করা, ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করা, যালিমদের যুলুম থেকে মযলুমদের রক্ষা করা ইত্যাদি সমাজসেবার কাজ করতে গিয়ে রাসূল (সা.) মানুষের দরদে বড়ই বেদনাবোধ করতেন।

তিনি যে রাসূল হবেন সে কথা তো ওহী নাযিল হওয়ার পরই তিনি বুঝতে পেরেছেন; কিন্তু যে আল্লাহ তাঁকে রাসূল নিযুক্ত করেছেন, তিনি তো আগেই জানতেন। তাই আল্লাহ তা‘আলা রসূলের যোগ্য করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই সমাজসেবার মাধ্যমে তাঁকে সমাজ-সচেতন করে তোলেন। কারণ, যে কাজটি তাঁকে করতে হবে তা সমাজ বিপ্লবেরই কাজ। মানুষের মনগড়া প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বদলে আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সর্বক্ষেত্রেই যে পরিবর্তন আনতে হবে তা এত বড় বিপ্লবী কাজ, যার জন্য বিরাট দরদি মন দরকার। তাই পরম মানবদরদি হিসেবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে গড়ে তুলেছেন।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলার একটা মূলনীতি উল্লেখ করা প্রয়োজন। আল্লাহ যাঁকে নবী বা রাসূল বানাতে চান তাঁকে তিনি জন্ম থেকেই সে উদ্দেশ্য গড়ে ওঠার সুযোগ দেন। আল্লাহ নিজেই তাঁর শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। মানুষের সমাজে বাস করলেও সমাজের কোন মানুষকে তাঁর শিক্ষক হতে দেয়া হয়নি। মানুষ শিক্ষক থেকে ভালো ও মন্দ দু’রকমের শিক্ষাই পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই একমাত্র আল্লাহই নবী (সা.)-এর শিক্ষক।

আরেকটা জরুরি কথা এই যে, ওহী নাযিলের আগে নবী জানতে পারতেন না যে, তিনি নবী হবেন। আল্লাহ জানেন তিনি নবী হবেন। তাই প্রত্যেক নবীর দেশবাসীই নবুওয়াত ঘোষণার আগে থেকেই তাঁকে সমাজের সবচেয়ে ভালো মানুষ বলে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। শেষ নবীকে নবুওয়াত ঘোষণার আগেই মক্কাবাসীরা ‘আল আমীন’ বা আমানতদার ও ‘আস সাদিক’ বা সত্যবাদী উপাধি দিয়েছে।

রাসূল (সা.)-এর নবুওয়াতী জীবনের ২৩ বছর

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স যখন ৪০ বছর তখন হেরা গুহায় সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত নাযিল হওয়ার পর থেকে ৬৩ বছর বয়সে দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়া পর্যন্ত মোট ২৩ বছর নবী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন গণনা করা হয়। প্রথম ওহীর মাধ্যমেই তাঁকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, তিনি নবী এবং ওহীর মাধ্যমে তাঁকে হিদায়াত দেয়া হবে। তখনো কাজের কোনো দায়িত্বের কথা নেই। সূরা ফাতিহাই প্রথম পূর্ণ সূরা হিসেবে নাযিল হয়েছে। এতেও কাজের কোনো দায়িত্বের কথা নেই। এ সূরা দ্বারা এ ধারণাই দেয়া হয়েছে যে, একমাত্র আল্লাহর হুকুম মেনেই নবীকে চলতে হবে, শুধু তাঁরই কাছে সাহায্য চাইতে হবে, সরল সঠিক পথ একমাত্র তাঁর নিকট থেকেই পাওয়া যাবে।

সূরা মুদ্দাসসিরের প্রথম সাত আয়াতে প্রথম কর্মসূচি দেয়া হলো। তিনি সে অনুযায়ী পরিচিত মহলে দাওয়াত দিতে থাকেন। কিছু কিছু করে ঈমানদারদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তিন বছর পর্যন্ত গোপনেই দাওয়াত পৌঁছাতে থাকেন। তখনো তেমন কেউ বাধা দেয়নি বলে অনেকেই রাসূল (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব ও দাওয়াত এবং কুরআনের ভাষা ও বাণীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তখন কুরাইশ নেতারাসহ সবার কাছেই জানাজানি হয়ে গেল, মুহাম্মাদ (সা.) এমন সব আকীদা-বিশ্বাস এবং মত ও পথের প্রচার করছেন, যা প্রচিলত সমাজের বিরোধী।

নবুওয়াতের তৃতীয় বছরের শেষদিকে রাসূল (সা.) সাফা পাহাড়ের উপর থেকে জোর গলায় এমন আওয়াজ দিয়েছেন, কুরাইশ সর্দাররাসহ মক্কাবাসীরা পাহাড়ের পাশে জমা হয়ে গিয়েছিল। তখনকার দিনে জনসভা ডেকে বক্তব্য রাখার এটাই নিয়ম ছিল। ঐদিনই তিনি প্রকাশ্যভাবে প্রথম তাওহীদের দাওয়াত পেশ করেন। প্রথমে তিনি জনগণ থেকে জানতে চেয়েছেন যে, তারা তাঁকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করে কি না।

মুহাম্মাদ (সা.) শুরুতেই বললেন, ‘যদি আমি বলি যে, পাহাড়ের পেছন দিকে এক দল শত্রু  আছে, যারা তোমাদের উপর হামলা করতে চায় তাহলে কি এ কথা তোমরা বিশ্বাস করবে?’ সবাই একবাক্যে জবাব দিয়েছিল, ‘তুমি বললে অবশ্যই বিশ্বাস করব। কেননা, তোমাকে কোনো দিন মিথ্যা বলতে শুনিনি।’

এরপর রাসূল (সা.) এই প্রথম জনসভায় স্পষ্ট ভাষায় অতি দরদী সুরে ও আবেগের সাথে কালিমায়ে তাইয়্যিবার বিপ্লবী দাওয়াত পেশ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে কুরাইশ সর্দার আবূ জাহ্‌ল চিৎকার করে এর প্রতিবাদে প্রকাশ্য বিরোধিতা শুরু করেছিল। মক্কার নেতারা বুঝতে পেরেছিল, মুহাম্মাদের মতো জনপ্রিয় নেতার পেছনে জনগণ যেভাবে সাড়া দিচ্ছে, তা এভাবে চলতে দিলে তাদের নেতাগিরি খতম হয়ে যাবে। সমাজব্যবস্থা বদলে যাবে। নতুন নেতা নতুন আইন জারি করবে। তাদের কর্তৃত্ব, স্বার্থ, সুযোগ-সুবিধা সব হারাতে হবে।

ধর্মীয় নেতারা আরও বেশি খেপে গিয়েছিল। এভাবেই আল্লাহর নবীর আহ্বানের বিরোধিতা শুরু হয়েছিল। প্রথমে সব নেতা মনে করেছিল, মুহাম্মাদ নেতৃত্ব চাচ্ছেন। অর্থাৎ, তারা নিজেদের ধারণা অনুযায়ী দুনিয়ায় মানুষ যেসব কারণে, নেতৃত্ব ও ক্ষমতা চায় তা রাসূল (সা.)-এর উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল এবং সমাজে নতুন কথা বলে সমস্যা সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছিল।

তারা বলেছিল, ‘তোমাকে বাদশাহ মেনে নেব, যত ধন-দৌলত চাও সবই দেব, যত সুন্দরী নারী চাও তাও দেব।’ তারপরও তুমি এ আন্দোলন বন্ধ কর। তিনি যখন এ প্রস্তাব মেনে নেননি তখন তারা হাজারো অপপ্রচার চালিয়েছিল যাতে জনগণ তাঁর দলে যোগ না দেয়। এতেও যখন কাজ হয়নি, তখন যাঁরা রাসূল (সা.)-এর প্রতি ঈমান এনেছিল তাদের উপর সব রকমের অত্যাচার চলাতে শুরু করে।

নবুওয়াতের পঞ্চম বছর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় রজব মাসে ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন মহিলা সাহাবী রাসূল (সা.)-এর অনুমতি নিয়ে মক্কা থেকে হিজরত করে হাবশায় (বর্তমানে ইরিত্রিয়ায়) চলে গিয়েছিলেন। ক্রমেই যুলুমের মাত্রা বাড়তে থাকায় আরো ৮৮ জন পুরুষ ও ১৫ জন মহিলা সাহাবী হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। নবুওয়াতের সপ্তম থেকে নবম বছর পর্যন্ত রাসূল (সা.)-এর নিজ বংশ গোটা বনূ হাশিমকে মক্কাবাসীরা বয়কট করে রেখেছিল। ‘শিআবে আলী তালিব’ নামক উপত্যকায় পূর্ণ তিনটি বছর তাদেরকে চরম বন্দিজীবন কাটাতে হয়। বাইরে থেকে সেখানে পানি পর্যন্ত নিতে দেয়া হয়নি। গাছের পাতা খেয়ে তাদের দিন কাটাতে হয়েছিল।

দশম বছরে বন্দিদশা কেটে গেলেও বিরোধিতা আরো বেড়ে যায়। দশম বছরেই রাসূল (সা.)-এর চাচা আবূ তালিব ও খাদীজা (রাদিআল্লাহু আনহা) ইন্তিকাল করার পর শত্রুদের অত্যাচার এতটা বেড়ে গিয়েছিল যে, রাসূল (সা.)-কে হত্যার পরিকল্পনা পর্যন্ত করে কুরাইশরা। এর পরের তিন বছর বড়ই কঠিন সময় ছিল। মক্কা থেকে নিরাশ হয়ে রাসূল (সা.) তায়েফ গিয়েছিলেন। সেখানকার সর্দাররা তো দাওয়াত কবুল করেইনি; বরং একদল ছোকরাকে লেলিয়ে দিয়েছিল, যারা পাথর মেরে তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। রক্তাক্ত অবস্থায় শহরের বাইরে এক বাগানের পাশে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) এসে তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন যে, যদি তিনি চান তাহলে তখনই তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দেয়া হবে। তিনি কাতরভাবে বলেছিলেন, ‘আমি তাদের ধ্বংস চাই না, হয়ত তাদের বংশধররা দ্বীন কবুল করবে।’

এভাবে হিজরতের আগের তিন বছরে চরম বিরোধিতা ও নিষ্ঠুর অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। মক্কা ও এর আশপাশে কোথাও সামান্য আশার আলোও দেখা যায়নি। চরম নিরাশার ঐ অন্ধকারে হজ্জের সময় মদীনা থেকে আগত লোকদের মাঝে ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল। এ তিন বছরের প্রথম বছর ৬ জন, দ্বিতীয় বছর ১২ জন ও শেষ বছর ৭৫ জন লোক ইসলাম কবুল করে রাসূল (সা.)-কে মদীনায় নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আল্লাহর অনুমতি আসার পর রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ শুক্রবার তিনি মদীনায় পৌঁছেছেন। তখন থেকেই হিজরী সন গণনা করা হয়।

মদীনায় আউস ও খাযরাজ নামক দুটো বড় গোত্র ইসলাম কবুল করায় সেখানে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়েছিল। যারা হাবশায় হিজরত করেছিলেন তারাও সকলে মদীনায় এসে মিলিত হয়েছেন। গোটা আরবে যারাই যেখানে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদেরকে মদীনায় চলে আসার হুকুম দেয়া হয়েছিল। এভাবে মুহাজির ও আনসারদের নিয়ে মদীনায় ইসলামি সরকার গঠন করা হয়েছিল। মদীনার চারপাশের ইহুদি গোত্রগুলোর সাথে রাজনৈতিক সন্ধি করা হয়েছিল, যাতে তাদের সহযোগিতা পাওয়া যায়।

ইসলাম একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠায় কুরাইশ নেতারা সারা আরবের জাহেলি শক্তিকে সংগঠিত করে মদীনার ছোট ইসলামি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বারবার আক্রমণ করছিল, কিন্তু আল্লাহর সাহায্যে এবং রাসূল (সা.)-এর যোগ্য নেতৃত্বে মুসলিম জাতির ঈমানী শক্তি ও শাহাদাতের আবেগ বিজয়ী হয়েছিল।

দ্বিতীয় হিজরীর রমাদান মাসে বদর যুদ্ধ, তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে ওহুদ যুদ্ধ এবং পঞ্চম হিজরীর যিলকদ মাসে হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়েছে। অষ্টম হিজরীর রমাদান মাসে যুদ্ধে আরব শক্তির চূড়ান্ত পরাজয় ও ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় হয়েছিল। নবম হিজরীর রজব মাসে তাবুকে রোম সম্রাটের সাথে যুদ্ধের জন্য মুসলিম বাহিনী হাজির হলেও রোমান বাহিনী পিছিয়ে যাওয়ায় সারা আরবে এর এমন প্রভাব পড়েছিল যে, দলে দলে বিভিন্ন গোত্র ইসলাম কবুল করেছিল।

এভাবে দীর্ঘ ২৩ বছরে রাসূল (সা.)-এর বলিষ্ঠ ও বিপ্লবী নেতৃত্বে পরিচালিত ইসলামি আন্দোলন মানবজাতিকে মানুষের গোলামি থেকে মুক্ত করে সত্যিকার আর্দশ নমুনা পেশ করেছিল। এ আদর্শ যুগে যুগে ইসলামি আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে চলেছে এবং কুরআনই এ আন্দোলনের গাইড বুক হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতিকে পরিচালনা করতে থাকবে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই কিয়ামত পর্যন্ত এ আন্দোলনের চিরস্থায়ী নেতা।

সুতরাং তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে সফল হওয়া সম্ভব। আল্লাহর প্রভুত্ব ও রাসূল (সা.)-এর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামি আন্দোলনের আসল উদ্দেশ্য।

দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন

যেহেতু কুরআন দ্বীন প্রতিষ্ঠার গাইড বুক, সেহেতু কুরআনকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে রাসূল (সা.)-এর আন্দোলন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। জনগণের সহযোগিতা নিয়ে কোনো কিছু প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টাকেই আন্দোলন বলা হয়। যেমন—  ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ইত্যাদি। তেমনি ইসলামি জীবনবিধানকে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টার নামই ইসলামি আন্দোলন। কুরআনের ভাষায় এর নাম ‘জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ’। বিরোধী শক্তির সাথে মুকাবিলা করে এগিয়ে চলার চেষ্টাকেই জিহাদ বলে। আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার এ ধরনের চেষ্টাই হলো আল্লাহর পথে জিহাদ বা ইসলামি আন্দোলন। এর আরো কয়েকটি নাম চালু আছে। যেমন—  ইসলামি রাষ্ট্র, ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা, ইসলামি হুকুমত, ইসলামি খিলাফত, নেযামে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বা ইকামাতে দ্বীনের আন্দোলন।

এ উদ্দেশ্যে যখন জনগণকে সংগঠিত হওয়ার ডাক দেয়া হয়, তখনই ইসলামি আন্দোলনের সূচনা হয়। ইসলাম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যখন একদল লোক দাওয়াত ও কর্মসূচি নিয়ে ময়দানে কর্মতৎপর হয় তখন সমাজের কায়েমী স্বার্থ বিভিন্নভাবে বাধা দেয়। আন্দোলন যতই শক্তিশালী হতে থাকে, বাধাও ততই বেশি জোরেশোরে চলতে থাকে।

কারা বাধা দেয়? কেন তারা বাধা দেয়? সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশ যারা চালাচ্ছে, তারাই বাধা দেয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সামাজিক নেতৃত্ব যাদের হাতে তারা, এমনকি একশ্রেণীর ধর্মীয় নেতাও দুনিয়ার স্বার্থেই বাধা দেয়। দেশ যেভাবে চলছে, সেভাবে চলতে থাকলে যাদের স্বার্থ কায়েম থাকে তারাই বাধা দেয়। তাই এদেরকে কায়েমী স্বার্থ (Vested Interest) বলা হয়। ইসলামি আন্দোলন প্রচলিত ব্যবস্থা উৎখাত করে আল্লাহর আইন ও সৎলোকের শাসন চালু করতে চায়। সুতরাং প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা যারা চালু রাখতে চায়, তারা নিজেদের নেতৃত্ব ও স্বার্থ কায়েম রাখার উদ্দেশ্যেই ইসলামি আন্দোলনকে সর্বশক্তি দিয়ে রুখতে চায়। কারণ, এ আন্দোলন বিজয়ী হলে দেশে নতুন নেতৃত্ব কায়েম হবে এবং কায়েমী স্বার্থ শেষ হয়ে যাবে।

আন্দোলনের শুরু থেকে বিজয় পর্যন্ত গোটা সময়টাকে দুটো যুগে ভাগ করে নিলে বুঝতে সহজ হয়। শুরু থেকে বিজয়ের আগে পর্যন্ত সময়টাকে সংগ্রামী যুগ এবং পরের সময়টাকে বিজয়যুগ বলা যায়। রাষ্ট্রক্ষমতা আন্দোলনের নেতাদের হাতে এলেই বিজয়যুগ শুরু হয়। সংগ্রামী যুগকে ব্যক্তিগঠনের যুগও বলা যায়। কারণ, কোনো আন্দোলনই হঠাৎ সফল হয় না। বিজয় আসার আগে আন্দোলন যে আদর্শ কায়েম চায় সে আদর্শ অনুযায়ী একদল যোগ্য নেতা এবং নিষ্ঠাবান কর্মীর একটি দল তৈরি করতে হয়। তাই এ যুগকে ব্যক্তিগঠনের যুগ বলা হয়। যখন এ নেতাদের হাতে দেশের ক্ষমতা এসে যায় বিজয়যুগ শুরু হয়। এ যুগের আরেকটি নাম হলো সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনের যুগ। এ সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল অঙ্গনকে ঐ আদর্শ অনুযায়ী গড়ে তোলা হয়।

কুরআনী আন্দোলনের যুগ বিভাগ

রাসূল (সা.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের প্রথম ১৩ বছরকে সংগ্রামী যুগ বা ব্যক্তিগঠনের যুগ এবং পরবর্তী ১০ বছরকে বিজয়যুগ বলা হয়। সংগ্রামী যুগে তিনি মক্কাকে কেন্দ্র করে কাজ করেছেন বলে এ যুগকে মাক্কী যুগও বলা হয়। আর হিজরতের পর থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত যে যুগ, এর কেন্দ্র মদীনায় ছিল বলে সে যুগকে মাদানী যুগ বলা হয়। আল কুরআনের সূরাগুলো এ দুটি যুগের ভিত্তিতেই মাক্কী ও মাদানী সূরা হিসেবে পরিচিত। তাই সংগ্রামী যুগের ১৩ বছরে যেসব সূরা নাযিল হয়েছে তা মাক্কী সূরা এবং পরবর্তী ১০ বছরে যেসব সূরা নাযিল হয়েছে তা মাদানী সূরা বলে গণ্য।

এ কথা বোঝা দরকার যে, হিজরতের পর মক্কা ও মিনায় এবং হুদাইবিয়া থেকে মদীনায় ফিরে যাওয়ার পথেও কিছু সূরা নাযিল হয়েছে। তাই কোনো সূরা সম্পর্কে এভাবেই বলা উচিত যে, ‘সূরাটি মাদানী যুগে নাযিল’। ‘সূরাটি মদীনায় নাযিল হয়েছে’ বললে সঠিক না-ও হতে পারে। কারণ, মদীনার বাইরে নাযিল হলেও এ যুগের সূরাকে মাদানী সূরাই বলতে হয়।

মাক্কীযুগের বিভিন্ন স্তর

এর আগে ‘নবুওয়াতী জীবনের ২৩ বছর’ শিরোনামে যে আলোচনা করা হয়েছে, সেখানে মাক্কী যুগের প্রধান ঘটনাবলীর উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনাগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায় এবং এক-একটি ভাগকে স্তর বলা যায়—

প্রথম স্তর: নবুওয়াতের প্রথম তিন বছর সময়কে গোপনে দাওয়াতী কাজের স্তর বলা হয়।

দ্বিতীয় স্তর: তৃতীয় বছরের শেষদিক থেকে প্রায় দু’বছর সময়কে দ্বিতীয় স্তর বলা যায়। এ সময়ে আন্দোলনকে বিভিন্নভাবে বাধা দেয়া হলেও তখনো অত্যাচার শুরু হয়নি। ঠাট্টা-বিদ্রূপ, মিথ্যা-প্রচার ও দুর্নাম ছড়িয়ে এ সময় বাধা দেয়া হয়েছে।

তৃতীয় স্তর: নবুওয়াতের পঞ্চম বছরের শেষদিক থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময়কে তৃতীয় স্তর বলা যায়। এ সময়ে রাসূল (সা.)-এর উপর যারা ঈমান এনেছে তাদের উপর সব রকমের যুলুম ও নির্যাতন চালানো হয়েছে। অত্যাচার-নির্যাতন সত্ত্বেও ঈমানদারদের ইসলাম থেকে ফেরানো যায়নি বলে যুলুমের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছিল।

চতুর্থ স্তর: দশম বছরে রাসূল (সা.)-এর চাচা আবূ তালিব ও খাদীজা (রাদিআল্লাহু আনহা) ইন্তিকাল করার পর বিরোধীদের সাহস বেড়ে যায় এবং তারা রাসূল (সা.)-কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিয়ে ফেলেছিল। হাশেমী বংশের সম্মানিত নেতা হিসেবে আবূ তালিবকে সবাই সমীহ করত এবং খাদীজা (রাদিআল্লাহু আনহা)-কেও তারা সম্মান করত বলে এতদিন রাসূল (সা.)-এর উপর তারা হামলা করেনি। বিরোধীরা এত বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করেছিলে যে, রাসূল (সা.)-এর যে কয়জন সাহাবী (রাদিআল্লাহু আনহুম) মক্কায় ছিলেন তাঁদের জীবনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।

মাক্কী যুগের স্তরভিত্তিক সূরার তালিকা

মাদানী সূরাগুলো বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় সূরার বক্তব্য বুঝতে বেশি বেগ পেতে হয় না। কোন্ অবস্থায় ও কোন্ সময় কোন্ সূরা নাযিল হয়েছে, তা সূরার মধ্যেই খোঁজ করে পাওয়া যায়। মাদানী যুগের ইতিহাস ইসলামের বিজয়যুগের ঘটনাবলীরই সমষ্টি; তাই বিজয়ের পরের ইতিহাস বিস্তারিত লেখা হয়েছে। এ কারণেই মাদানী সূরাগুলোর বক্তব্য বোঝা সহজ হলেও মাক্কী সূরাগুলোর বাক্য বোঝা তেমন সহজ নয়। তবে মাক্কী যুগের চারটি স্তরের কোন্ স্তরে কোন্ কোন্ সূরা নাযিল হয়েছে, তা জানতে পারলে সূরার বক্তব্য বুঝতে অনেক সুবিধা হয়।

অবশ্য স্তরের ভিত্তিতে সূরার তালিকা তৈরি করা বেশ কঠিন কাজ। তবে আল-কুরআনের গবেষকগণ এরই ভিত্তিতে প্রথম স্তরে ২৮টি, দ্বিতীয় স্তরে ১১টি, তৃতীয় স্তরে ৩৭টি এবং চতুর্থ স্তরে ১৩টি মোট ৮৯টি সূরাকে তালিকাভুক্ত করেছেন। পূর্বেও বলা হয়েছে, মাক্কী সূরাগুলো নাযিলের সঠিক সময়ে হিসাব করা খুবই কঠিন। যেসব সূরা সম্পর্কে স্পষ্ট রেওয়াতে পাওয়া যায়নি, সেগুলোর ভাষা ও বাচনভঙ্গি এবং আলোচ্য বিষয়বস্তুর ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তাই মাক্কী সূরাগুলোকে উপরিউক্ত চারটি স্তরে যেভাবে সাজানো হয়েছে, তা একেবারে নির্ভুল বলে দাবি করার উপায় নেই। তবুও এ স্তরবিন্যাস সূরাগুলোর বক্তব্য বুঝতে সাহায্য করবে বলেই আশা করা যায়। আর সেটাই এ স্তরবিন্যাসের মূল উদ্দেশ্য।

রাসূল (সা.)-এর জীবনটাই কুরআন

কেউ যদি রাসূল (সা.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন ও তাঁর ২৩ বছরের সংগ্রামী জীবন থেকে কুরআনকে বোঝার চেষ্টা করে, তবেই এ কিতাবকে সহজে ও সঠিকভাবে বোঝা যাবে। শুধু কুরআন বা এর অনুবাদ থেকে যদি এ কিতাবকে কেউ বুঝতে চায় তাহলে সে কিছুই বুঝতে পারবে না।

আল্লাহ তা‘আলা তো কুরআনকে আলাদাভাবে বই হিসেবে পাঠাননি। যে রাসূলের উপর কুরআন নাযিল হয়েছে, তাঁর উপরই এ কিতাব বোঝানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ কিতাবের আসল অর্থ, সঠিক ব্যাখ্যা ও যাবতীয় শিক্ষা একমাত্র রাসূল (সা.)-কেই আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিয়েছেন। তাই তিনিই কুরআনের একমাত্র বিশ্বস্ত সরকারি (official) ব্যাখ্যাকারী বা মুফাসসির।

এ পর্যন্ত যত তাফসীর লেখা হয়েছে এবং আরো যত লেখা হবে, তাতে যদি এমন কোনো ব্যাখ্যা থাকে যা রাসূল (সা.)-এর ব্যাখার বিরোধী, তাহলে তা কিছুতেই শুদ্ধ বলে গ্রহণ করা যাবে না। রাসূল (সা.)-এর ব্যাখ্যার বিরোধী না হলে যত নতুন কথাই বলা হয়েছে বা হবে তা বিবেচনা করা যেতে পারে এবং যুক্তিপূর্ণ মনে হলে মেনে নেয়া চলে।

আমরা যে কুরআন তিলাওয়াত করি তা শুধু কুরআনের আয়াত, শব্দ ও বর্ণ। এ কুরআনের বাস্তব নমুনা রাসূল (সা.)। তিনিই আসল কুরআন ও জীবন্ত কুরআন। তাঁর কথা, কাজ ও অনুমোদন কুরআনেরই সরকারি ব্যাখ্যা। এ কারণেই হাদীসকেও ওহী বলে বিশ্বাস করতে হবে। তবে কুরআনের শব্দ যেমন ওহী, হাদীস তেমন নয়। হাদীসের ভাষা ওহী নয় বটে; কিন্তু হাদীসের ভাব ও মর্ম অবশ্যই ওহী। তাই হাদীস কুরআনেরই ব্যাখ্যা। এ জন্য কুরআনের হিফাযতের প্রয়োজনেই রাসূল (সা.)-এর জীবনী ও হাদীসকে আল্লাহ তা‘আলা হিফাযত করেছেন।

সুতরাং রাসূল (সা.) কর্তৃক পরিচালিত আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে আলাদা করে কুরআন বোঝার কোনো উপায় নেই। কেউ এ আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করুক বা না করুক, কুরআন বুঝতে হলে তাকে রাসূলের (সা.) পরিচালিত আন্দোলনের গতিধারা, এর বিভিন্ন যুগ ও স্তর সম্পর্কে অবশ্যই ভালো করে বুঝতে হবে এবং ঐ আন্দোলনের সাথে মিলিয়েই এ মহান কিতাবকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

তিলাওয়াত  বুঝে পড়ার গুরুত্ব

তিলাওয়াত শব্দের অর্থ ‘মুখে উচ্চারণ করে পড়া’ আর মুতালা’আ শব্দের অর্থ ‘মনোযোগ দিয়ে বুঝে বুঝে পড়া’। কুরআন এমন কিতাব, যা না বুঝেও অগণিত মানুষ পড়ে। এমনকি আমাদের দেশসহ বহু দেশে যারা মাতৃভাষা পর্যন্ত পড়তে শেখেনি তারাও কুরআন পড়ে। সওয়াবের আশায় এবং ইবাদতের নিয়্যতে কুরআন তিলাওয়াত করলে প্রতিটি অক্ষরের জন্য কমপক্ষে ১০টি করে নেকীর সুসংবাদ রাসূল (সা.) দিয়েছেন। এমনকি যারা কোনো রকমে কষ্ট করে ঠেকে ঠেকে পড়ে তারা দ্বিগুণ নেকী পাবে বলে হাদীসে আছে।

কিন্তু কুরআন বুঝে পড়ার জন্য তো কুরআনেই তাকিদ দেয়া হয়েছে। কুরআন বোঝার মান সবার সমান নয়। যারা নিজে পড়ে বুঝতে পারে না তারা অন্যের কাছে শুনে বুঝবে; কিন্তু যাদের বুঝে পড়ার যোগ্যতা আছে তারা বোঝার জন্য চেষ্টা না করলে দোষী সাব্যস্ত হবে। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রয়োজনে যারা জীবনের বিরাট অংশ ডিগ্রি অর্জন ও বিদেশি ভাষা শিক্ষায় কাটিয়ে দেয়, তারা কুরআন বোঝার চেষ্টা না করলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। যারা কুরআন মুতালা’আ (recitation) করেন, তাদেরও উচিত প্রথমে এক বা একাধিক রুকূ তিলাওয়াত করে তারপর যতটুকু বোঝা সম্ভব, সে উদ্দেশ্যে অধ্যয়ন করা। তাফসীর পড়ায় মনোযোগ দিয়ে তিলাওয়াত বাদ দেয়া মোটেই উচিত নয়। তিলাওয়াত দ্বারা আল্লাহর কালামের স্বাদ পাওয়া যায় এবং কুরআনের সাথে ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। তাই প্রতিদিনই কিছুটা তিলাওয়াত করা উচিত। অধ্যয়ন ছাড়াও যতটা সম্ভব তিলাওয়াত করতে পারলে রূহানী তৃপ্তি পাওয়া যাবে।

কুরআন বোঝার উদ্দেশ্যে যারা অধ্যয়ন করেন তাদেরকে নিম্নের কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে:

১. যে সূরা বা যে সূরার কোনো অংশ বুঝতে চাই তা মাক্কী না মাদানী তা প্রথমে জানতে হবে।

২. মাক্কী সূরা হলে মাক্কী যুগের কোন্ স্তরে সূরাটি নাযিল হয়েছে তা খোঁজ করতে হবে।

৩. যে স্তরে সূরাটি নাযিল হয়েছে, সে সময়কার অবস্থা ও পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। রাসূল (সা.)-এর বিরোধীদের ভূমিকা তখন কী ছিল তা জানতে হবে। এসব বিষয়কে তাফসীরের পরিভাষায় ‘শানে নুযুল’ বলা হয় অর্থাৎ নাযিল হওয়ার পটভূমি, পরিস্থিতি ও পরিবেশ।

৪. তাফসীর অধ্যয়ন করলে সূরাটির ভূমিকা মনোযোগ দিয়ে পড়ে তা স্মরণে তাজা রেখে অনুবাদ ও তাফসীর অধ্যয়ন করতে হবে।

৬. এ কথা যেন স্মরণে তাজা থাকে যে, মাক্কী সূরার আলোচ্য বিষয় প্রধানত তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত। ঈমান ও চরিত্র গঠনের শিক্ষাই মাক্কী যুগের সূরার মূল বিষয়। বহু জাতির কাহিনী ও নবী-রাসূলগণের ঘটনাবলীর মধ্যেও ঐ শিক্ষাটুকুই আসল উদ্দেশ্যে। মাক্কী যুগে ব্যক্তি গঠনের জন্য ওহী নাযিল হয়েছে। তাই সমাজ গঠনের নিয়ম-কানুন মাক্কী সূরায় পাওয়া যায় না।

৭. পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন এবং পরিচালনার জন্য যাবতীয় বিধি-বিধান ও হালাল-হারামের বিস্তারিত আইন বর্ণনা মাদানী সূরার প্রধান আলোচ্য বিষয়।

দ্বীন প্রতিষ্ঠাকারী  কুরআন

আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা বা বাস্তবায়ন করার আন্দোলনে অংশ নেয়া প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। আর এটা আগেই বলা হয়েছে যে, কুরআন ইসলামী জীবন বিধান প্রতিষ্ঠার গাইড বুক বা দিশারী ও দিকনিদের্শক। তাই এ আন্দোলনের সংগ্রামী যুগ বা ব্যক্তি গঠনের যুগে রাসূল (সা.)-এর মাক্কী যুগের বিভিন্ন স্তর আসবেই। যখন যে স্তর আসবে ঐ স্তরের সূরাগুলো পড়ার সময় দায়ীদের মনে হবে, যেন তাদের জন্যই এসব হিদায়াত এখন আবার নাযিল হয়েছে।

একটি সহজ উদাহরণ থেকে কথাটা বুঝে আসে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বা খুলনা কিংবা দিনাজপুর যেতে হলে ট্রেনে বা বাসে যেসব স্টেশন হয়ে যেতে হয়, তা প্রত্যেক যাত্রীকেই পার হতে হয়। তেমনি রাসূল (সা.)-কে কালেমা তাইয়্যিবার দাওয়াত থেকে শুরু করে মদীনায় ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম হওয়া পর্যন্ত যে যে অবস্থা ও পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে হয়েছে তা সব যুগের ও সব দেশের ইসলামি আন্দোলনের সামনে অবশ্যই আসবে। তাই দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী যখন কুরআন অধ্যয়ন করে তখন সে শুধু অতীত আন্দোলনের ইতিহাসই পড়ে না, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও ওই ইতিহাসে খুঁজে পায়। যারা এ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নয়, তাদের বিরোধী শক্তির মুখোমুখি হতে হয় না বলে তারা দূর থেকে শুধু অতীত ইতিহাস পড়ার মতোই কুরআন অধ্যয়ন করে।

এ কথা সত্যিই বড় মধুর অভিজ্ঞতা যে, ইসলামী আন্দোলনের উত্তাল সমুদ্রে জীবনতরী যে ভাসিয়ে দেয়, কুরআনের মর্মবাণী অত্যন্ত উদারভাবে তার অন্তরে সহজেই ধরা দেয়। কুরআন এ ধরনের লোকের জন্য নাযিল হয়েছে। এ জাতীয় ক্ষুধিত মনের খোরাকই কুরআন পরিবেশন করে থাকে। যিনি এ মহান কিতাব নাযিল করেছেন, তিনি তো এমন লোকদের হিদায়াতের উদ্দেশ্যেই তা পাঠিয়েছেন। তাই আল্লাহ তা’আলা তাদের অন্তরকে কুরআন বোঝার জন্য প্রশস্ত করে দেন। তখন কুরআন শুধু অধ্যয়নই করা হয় না; কুরআন তাদের গাইডে পরিণত হয়। কুরআন তাদের মনকে সজীব করে, চোখে আলো দান করে, দুশ্চিন্তা দূর করে, হতাশায় ভরসা দেয়, বিপদে সাহস যোগায় এবং আল্লাহ তা’আলার সাথে ঘনিষ্ঠ ভালবাসা সৃষ্টি করে।

কুরআন থেকে এসব বৈশিষ্ট্য হাসিলের উদ্দেশ্যে রাসূল (সা.) দু‘আ করেছেন, “হে আল্লাহ! কুরআন দ্বারা আমার কালবকে সজীব কর, আমার দৃষ্টিকে আলোকিত কর, আমার দুঃখ-বেদনা দূর কর এবং দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দাও।”

Facebook Comments